অনলাইন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১ প্রিন্ট
শান্ত বণিক, বিশেষ প্রতিনিধি, কালিহাতী থেকে ফিরে:
টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতির অন্যতম ঐতিহ্য হচ্ছে তাঁত শিল্প। কালিহাতি উপজেলার বল্লা, রামপুর, মমিননগর, সিংগাইর, ছাতিহাটি, কামান্না, টেঙ্গুরিয়া, নাগবাড়ি, ঘোনাবড়ি, জোড়বাড়ি, তেজপুর, গান্ধিনা, বড়টিয়াবাড়ি, বাংড়া, সহদেবপুর, কাজিবাড়ি, দড়িখশিলা ও কদিমখশিলা গ্রামের লোকের দীর্ঘ দিন ধৈর্য্যধারণ দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা তাদের তৈরী তাঁতের শাড়ির বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের পূজা এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সব রকম উৎসব আয়োজনে, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও আমলাদের স্ত্রী-কন্যাদের চাহিদা ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে টাঙ্গাইলের তৈরি তাঁতের শাড়ি। এটি বাঙালী জাতির হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য। ভ্রমণ পিপাসু বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এদেশে এসেছিলেন তার লেখায় টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পের বিধৃত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে ইউরোপ আমেরিকা জয় করেছে টাঙ্গাইলের তাঁত বস্ত্র। টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প আজ যে বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে তা একদিনে আসেনি। বসাকদের অপরিসীম ত্যাগ, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রমের ফলেই টাঙ্গাইলের এককালের সাধারণ মানের তাঁতের শাড়ি আজ বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতীরাই টাঙ্গাইলের আদি তাঁতী। এদেরকে এক শ্রেণীর যাযাবরও বলা যায়। সিন্ধু সভ্যতার অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদে এসে তাঁতের শাড়ি বুননের কাজ শুরু করেন। সেখানকার আবহাওয়ায় শাড়ির মান ভাল না হওয়ায় নতুন জায়গার সন্ধানে বের হয় বসাকরা। চলে আসে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানকার আবহাওয়া তেমন ভাল না থাকায় বসাকরা দুদলে বিভক্ত হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্যদল ঢাকার ধামরাইয়ে। এদের কিছু অংশ সিল্কের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যান। ধামরাইয়ে শাড়ির মান তেমন একটা ভাল না হওয়ায় আরও ভাল জায়গা খোঁজ করতে করতে টাঙ্গাইলে এসে বসতি স্থাপন করে। টাঙ্গাইলের আবহাওয়া তাঁতের শাড়ি বুননের উপযুক্ত হওয়ায় পুরোদমে তাঁতের কাজ শুরু করেন বসাকরা।
এক সময় টাঙ্গাইলের বেশিরভাগ এলাকাজুড়েই ছিল বসাকদের বসবাস। তারা অনভিজ্ঞদের বসাক সমিতির মাধ্যমে কাপড় বুননের প্রশিক্ষণ দিতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বসাক তাঁতীরা ভরতে চলে যায়। ওই সময় বসাক ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাঁত শিল্পের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে পরে। তারাও বসাক তাঁতীদের মত দক্ষ হয়ে উঠেন। বর্তমানে টাঙ্গাইলের সর্বাধিক তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা- টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাজিতপুর, সুরুজ, বার্থা, ঘারিন্দা, তারুটিয়া, বেলতা, গরাসিন। কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, মমিননগর, সিংগাইর, ছাতিহাটি, কামান্না, টেঙ্গুরিয়া, নাগবাড়ি, ঘোনাবড়ি, জোড়বাড়ি, তেজপুর, গান্ধিনা, বড়টিয়াবাড়ি, বাংড়া, সহদেবপুর, কাজিবাড়ি, দড়িখশিলা, কদিম খশিলা, কুকরাইল। দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, নলসন্ধা প্রভৃতি গ্রামে টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরি হয়। এসব এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শোনা যায় মাকুর খট-খট শব্দ। দেখা যায় তাঁত শিল্পীদের নিপুন হাতে শাড়ি বুনার দৃশ্য। টাঙ্গাইলের লক্ষাধিক তাঁতের সাথে জড়িত আছে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা। টাঙ্গাইল শাড়ি বুনে পুরুষরা, চরকায় সূতা কেটে সহায়তা করে মহিলারা। টাঙ্গাইল শাড়ি বুনার তাঁত কয়েকরকমের রয়েছে তারমধ্যে চিত্তরঞ্জন (মিহি), পিটলুম (খট-খটি), অটোমেটিক, সেমি অটোমেটিক তাঁত উল্লেখযোগ্য। এসব তাঁতে তৈরি হয় নানা রঙ ও ডিজাইনের নানা নামের শাড়ি। কালিহাতির বল্লা ও আশেপাশের বিভিন্ন ফ্যাক্টরীতে তৈরি হয়, জামদানি, বালুচুরি, সফ্ট সিল্ক, হাফ্ সিল্ক, হাজারবুটি, থান, বেনারশী, সম্বলপুরী, সুতি পাড়, কটকি, স্বর্ণচুর, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, প্রভৃতি ও সাধারণ নামের শাড়ি। এর মধ্যে জামদানির দাম সবচেয়ে বেশি। জামদানি তৈরি হয় আন্তর্জাতিক মানের। এ শাড়ি তৈরির জন্য ৮২ কাউন্টের সূতা ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও টাঙ্গাইলের তাঁতীরা গামছা, লুঙ্গি ও চাদর তৈরি করে থাকে।
এই উপজেলায় রয়েছে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব। কালিহাতি প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বগণের মধ্যে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী(সাবেক-এম.পি ও মাননীয় মন্ত্রী), শাজাহান সিরাজ (স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষনা ও কর্মসূচী উপস্থাপন করেন), স্পীকার আবদুল হামিদ চৌধুরী,বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ,বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম), ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখগণ উল্ল্যেখযোগ্য।আবু সাঈদ চৌধূরী ঢাকা হাইকোর্ডের বিচারপতি ,কেন্দ্রিয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের সভাপতি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মত পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রুপে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে বিদেশে সাহসী ও সচেতন ভূমিকা রাখেন । ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃতি করেন । এই কৃতি মানুষটি ১৯৮৭ সালের ২ আগষ্ট মৃত্যুরবন করলে তার জন্মস্থান কালিহাতি নাগবাড়ীতে পিতা আব্দুল হামিদ চৌধুরী ( পূর্ব পাকিস্থান গণ পরিষদের স্পিকার) কবরের পাশে সমাহিত করা হয় । ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুব্দে যাদের অবদান ছিল অতুলনীয় তারা হলেন আব্দুল লতিফ সদ্দিকী ,বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও নাম না জানা আরো অনেকে । সবাই ছিল কালিহাতির সন্তান ।
গতকাল সোমবার প্রাকৃতিক সুন্দরে ঘেরা এই উপজেলাটি ঘুরে খুবই ভালো লেগেছে। এরই প্রেক্ষিতে তথ্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হলো।
Posted ১০:১৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]