মোঃ আলতাফ হোসেন বাবু, বিভাগীয় চিফ রাজশাহী।
শনিবার, ১৬ মে ২০২৬ প্রিন্ট
আরডিএ কতৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আগে থেকেই আলোচিত এই প্রকৌশলীকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে,।দুদকের একাধিক মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এখনো একই পদে বহাল আছেন।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। ২০০৪ সালের ১৬ আগস্ট আরডিএ ১০টি পদের বিপরীতে ১১ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে আবেদন করেন শেখ কামরুজ্জামান।
লিখিত পরীক্ষার পূর্ণমান ছিল ১০০ এবং পাস নম্বর ছিল ৩৩। কিন্তু তিনি পান মাত্র ২৪ নম্বর। ফলে তিনি লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এরপরও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সূত্র মতে আরও জানা যায়, তাকে চাকরি দেওয়ার জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেন। সেই নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং সদস্য সচিব ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র শেখ কামরুজ্জামানকে নিয়োগ দিতেই পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়। অথচ লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনেক প্রার্থী ছিলেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী। অন্যদিকে কামরুজ্জামান মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করে পরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
এই নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিয়োগবঞ্চিতরা ২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৭ জুলাই দুদকের উপ-পরিচালক আব্দুল করিম শাহমখদুম থানায় মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি দুদকের উপ-পরিচালক ফরিদুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় শেখ কামরুজ্জামানের পাশাপাশি আরডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রব জোয়ার্দ্দারকেও অভিযুক্ত করা হয়।
২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব লুৎফুন নাহার আরডিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে মামলার অগ্রগতি, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার তথ্যসহ বিভিন্ন নথি চাইলেও পরে আরডিএ কর্তৃপক্ষ তার জবাব দেয়নি বলে জানা গেছে।
গোপনীয় ভাবে জানা যায়, দুদকের মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগদানের পর ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট পর্যন্ত শেখ কামরুজ্জামানের বৈধ আয় ছিল প্রায় ৪৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। কিন্তু এর মধ্যেই তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে রাজশাহী, ঢাকা ও কুষ্টিয়ায় একাধিক জমি, ফ্ল্যাট ও বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে, রাজশাহীর পবা পাড়ায় সাড়ে ৩ কাঠা জমি, ছোট বনগ্রাম চন্দ্রিমা আবাসিকে ৪ দশমিক ১৬ কাঠা জমি, পবার মুশরইলে ১৫ কাঠা, দাদপুর এলাকায় ৪৮ কাঠা জমি, ঢাকার মিরপুর সেনপাড়ায় ফ্ল্যাট, কুষ্টিয়ার জুগিয়ায় ৫৪ কাঠা জমি এবং কুষ্টিয়া সদরে বাড়ি। এছাড়া দুদকের মামলা হওয়ার পরও তিনি রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ এলাকায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদক ২০২২ সালের ১ জুন শেখ কামরুজ্জামান এবং ২ জুন তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করে। পরে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের কারাগারে পাঠায়। ওই সময় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতার প্রভাব ব্যবহার করে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আবার চাকরিতে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তার দাবি, হাইকোর্ট থেকে তিনি ছয় মাসের স্থগিতাদেশ পেয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর নতুন কোনো স্থগিতাদেশ না নিয়েও তিনি চাকরিতে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্না নিজেদের বিএনপিপন্থি সংগঠনের নেতা দাবি করে দুর্নীতির মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
পরে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বাধীন কমিটি মামলাগুলো প্রত্যাহারের সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কমিটির সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও পাবলিক প্রসিকিউটর।
রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. রইসুল ইসলাম বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে মামলাগুলো রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মনে হওয়ায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল বারী বলেন, শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা আদালতে চলমান রয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদককে কেউ অবহিত করেনি এবং মতামতও চাওয়া হয়নি।
দুদকের চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, শেখ কামরুজ্জামানের স্ত্রী নিশাত তামান্না সম্পদ বিবরণীতে ২৬ লাখ ১৭ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য দিলেও যাচাইয়ে প্রায় ৫৬ লাখ ৯১ হাজার টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রায় ৩০ লাখ ৭৪ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও প্রসঙ্গে শেখ কামরুজ্জামান দাবি করেছেন, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় একটি চক্র আমাকে ফাঁসিয়েছে। আমার সম্মানহানি ও আমাকে সমাজের কাছে খারাপ প্রমাণ করতে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে তথ্য মতে কয়েকজন আইটি ও এআই বিশেষজ্ঞ ভিডিওটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি নয়, বরং এটি আসল ভিডিও বলেই তারা মনে করছেন।
তথ্য সুত্রে জানা যায়, এ বিষয়ে আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিষয়টি এখনো তার নজরে আসেনি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Posted ০৩:১২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]