শান্ত বণিক, বিশেষ প্রতিনিধি
শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫ প্রিন্ট
দীর্ঘ ১৮ বছর, প্রায় দুই দশক পর স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসেছেন নরসিংদীর জাহাঙ্গীর আলম। জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে তিনি এখন নিজের পরিবারের সান্নিধ্যে, নিজ বাড়িতে। আর এই ফিরে আসার পেছনে ছিল নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা জাহান সরকারের অসামান্য মানবিক উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা।
জাহাঙ্গীর আলম নরসিংদী সদর উপজেলার চরদিঘলদী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল জিতরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। দরিদ্র জেলেপাড়ার সন্তান জাহাঙ্গীর জীবিকা নির্বাহ করতেন মেঘনার বিশাল বুকে মাছ ধরে। চার সন্তানের জনক জাহাঙ্গীর ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পঞ্চম সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে রেখে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন প্রায় দুই দশক আগে। প্রথমদিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও কিছুদিন পর থেকেই তার খোঁজ মিলছিল না। ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন—জাহাঙ্গীর হয়তো আর বেঁচে নেই।
হঠাৎ ফোন ইউএনওর অফিসিয়াল মোবাইলে:
গত ২১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসমা জাহান সরকারের অফিসিয়াল মোবাইলে ফোন আসে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে। ফোন করেন হাইকমিশনের কাউন্সিলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম। তিনি জানান, মালয়েশিয়ার এক ক্যাম্পে এক বাংলাদেশি আটক আছেন, যিনি অসুস্থ ও বাকশক্তিহীন। তার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র নেই।
পরবর্তীতে হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে ওই ব্যক্তির ছবি দিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে নিজেদের স্বজন দাবি করলেও যাচাই-বাছাইয়ে কারো দাবিই সত্য প্রমাণিত হয়নি। তবে নরসিংদী সদর উপজেলার এক ব্যক্তি মন্তব্যে জানান, ওই ব্যক্তি চরদিঘলদী ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে পারেন।
বিষয়টি যাচাইয়ের দায়িত্ব পান ইউএনও আসমা জাহান সরকার। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অনুসন্ধান শুরু করেন। অবশেষে খুঁজে পান জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারকে—যারা নিশ্চিত করেন, এ-ই সেই জাহাঙ্গীর আলম, যিনি ১৮ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে যাওয়ার পর।
মানবিক উদ্যোগে দেশে ফেরা:
পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ইউএনও আসমা জাহান সরকার বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করে দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সংগ্রহ করে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে সরকারি খরচে জাহাঙ্গীরকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করেন।
অবশেষে ৭ নভেম্বর ২০২৫ জাহাঙ্গীর আলম পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। তার পরিবারের সদস্যরা এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিয়ে আসেন নিজ বাড়িতে।
হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য:
গতকাল বিকেলে জাহাঙ্গীর আলমের খোঁজ নিতে যান ইউএনও আসমা জাহান সরকার। সেখানে পৌঁছে দেখেন এক আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘদিন জেল-হাজতে থাকার ফলে জাহাঙ্গীর এখন অসুস্থ, বাকশক্তিহীন, বাংলাও স্পষ্ট বলতে পারেন না। কেবল চেয়ে থাকেন আর অঝোরে কাঁদেন। এদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তার প্রিয়তমা স্ত্রী অন্যের সংসারে গেছেন।
জাহাঙ্গীর আলমের জীবনের গল্প যেন কোনো চলচ্চিত্রকেও হার মানায়—অপেক্ষা, হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা, আর বেদনাময় বাস্তবতার ছোঁয়া।
প্রশাসনের সহযোগিতা:
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে তাৎক্ষণিকভাবে নগদ ২০ হাজার টাকা ও কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়েছে। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন নরসিংদী জেলা হাসপাতালে।
ইউএনওর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া:
ইউএনও আসমা জাহান সরকার বলেন, সরকারি চাকরিতে নানা দায়িত্ব পালন করেছি, কিন্তু এই কাজটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আবেগতাড়িত করেছে। আমরা কেউই জাহাঙ্গীর আলমের হারানো সময় ফিরিয়ে দিতে পারব না, তবে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি—এটাই জীবনের পরম প্রাপ্তি।
তিনি আরও বলেন, কেউ যেন দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশে না যান। একটি ভুল যেন আর কারো সারাজীবনের কান্নার কারণ না হয়—এই কামনাই করি।
Posted ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫
dainikbanglarnabokantha.com | Shanto Banik
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]