নিজস্ব প্রতিবেদন
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ প্রিন্ট
বড় বড় অট্টালিকা, ট্রাফিক জ্যাম, দিনরাত কোলাহল, এই চিরচেনা শহর সবসময় ব্যস্ত থাকে, আপনার মন চাইলো আপনি একটু খেলাধুলা করতে পারবেন না। সকালে প্রাণ খুলে হাটতে পারবেন না |ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ রাখতে পরিবেশ রক্ষা, যানজট ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, এবং অবৈধ দখলমুক্ত করার বিকল্প নেই। সিটি করপোরেশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া শহরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যা বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং খাল-জলাশয় ভরাটের কারণে রাস্তাঘাটে হাঁটু পানি জমে যায়। ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি অনেক এলাকায় অপর্যাপ্ত, দুর্গন্ধযুক্ত এবং পানের অযোগ্য।যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা এবং বছরজুড়ে চলা অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ধুলোয় ঢাকার বায়ুর মান (AQI) প্রায়ই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পর্যায়ে পৌঁছায়। শহরের অধিকাংশ ফুটপাত হকার ও অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে থাকায় পথচারীদের রাস্তায় হাঁটতে হয়।
১ হাজার থেকে ২ হাজার নতুন মানুষ স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শহরমুখী এ জনস্রোতের কারণে প্রতি বছর রাজধানী ঢাকায় নতুন করে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ যুক্ত হচ্ছে।ঢাকার এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রবণতা ও গতিপ্রকৃতির মূল চিত্রগুলো নিচে দেওয়া হলো:দৈনিক ও বার্ষিক হার: বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং নগর গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কাজের সন্ধানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে রাজধানীমুখী হচ্ছে।শহরের জনসংখ্যা: জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি, যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ এখন ঢাকায় বাস করে।ঢাকায় আসার প্রধান কারণ: গ্রামীণ এলাকার তুলনায় রাজধানীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং নাগরিক সুবিধা বেশি থাকায় দিন দিন লোকসংখ্যা বেড়েই চলেছে।সাময়িক প্রবেশ: উৎসব বা বিশেষ সময়ে এই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ঈদের মতো উৎসবগুলোতে ঢাকা ছাড়েন প্রায় ১ কোটি মানুষ এবং ঢাকায় প্রবেশ করেন ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ।ফলো করুনমেগাসিটির মানদন্ড অনুযায়ী প্রতি একর আয়তনে জনসংখ্যা থাকার কথা ১২০ জন। গত ৫০ বছরে ঢাকার ভৌগোলিক আয়তন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হলেও স্বাধীনতার আগে যেখানে এ নগরে কয়েক লাখ লোক বসবাস করত, সেখানে এখন লোকসংখ্যা ২ কোটির ওপর। কিন্তু সেই তুলনায় সেবা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা অপ্রতুল। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন সংকট এবং সেই সঙ্গে জলাবদ্ধতার সমস্যা নগরজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব অফিস-আদালত, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি গড়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে। ফলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কর্মসংস্থানের। জীবিকা ও প্রয়োজনের তাগিদে এবং শহুরে জীবনের টানে মানুষ রাজধানীমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। রাজধানীর ওপর থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমাতে হলে রাজধানীকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক গড়ে তুলতে হবে। গ্রামাঞ্চল এবং ছোট শহরগুলোতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পের বিস্তার ঘটিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত জনংসখ্যার চাপ স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে।
দ্রুত যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে ১|সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান শহর থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে, ২|নতুন কোন বিশ্ববিদ্যালয় শহরে অনুমতি দেওয়া যাবে না, ৩|বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, ৪|শহরের ভিতরে থাকা ছোট্ট ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে বাইরে স্থানান্তর করতে হবে,
ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার (মেগাসিটি) জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। এখানে ২০ বছরে মানুষ বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এ জনসংখ্যার সঙ্গে প্রতিদিন নতুন ১ হাজার ৭০০ মানুষ যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। দেশে বছরে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ হারে মানুষ বাড়ছে। কিন্তু ঢাকা মেগাসিটিতে বাড়ছে ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ হারে। আর মেগাসিটির আশপাশে কোথাও কোথাও এই হার প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
যেসব নগরে এক কোটির বেশি মানুষ বাস করে, সেগুলোকে মেগাসিটি নাম দিয়েছে জাতিসংঘের বসতিবিষয়ক সংস্থা ইউএন হ্যাবিট্যাট। বিবিএস ও ইউএনএফপিএ বলছে, ঢাকা মেগাসিটি দেশের সবচেয়ে বড় পুঞ্জীভূত নগর এলাকা। চারটি সিটি করপোরেশন (ঢাকার দুটি, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর), দুটি বড় শহর (সাভার ও কেরানীগঞ্জ), চারটি সেনানিবাস (ঢাকা, মিরপুর, সাভার ও রাজেন্দ্রপুর) এবং কয়েকটি ছোট শহর ঢাকা মেগাসিটির অন্তর্ভুক্ত। দেশের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ এই মেগাসিটিতে বাস করে।
ইউএনএফপিএ বাংলাদেশে নগরায়ণ ও অভিবাসনের ওপর একটি প্রতিবেদন (আরবানাইজেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ) প্রকাশ করেছে । এতে বলা হয়েছে, ১৯৬০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ভারতের কলকাতা শহরের জনসংখ্যার ১০ ভাগের ১ ভাগ। ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কলকাতার জনসংখ্যার ৩ ভাগের ১ ভাগ। আর ২০০৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা কলকাতাকে ছাড়িয়ে যায়।
পাকিস্তান আমলে ছিল প্রাদেশিক রাজধানী। আর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ঢাকা দেশের রাজধানী। রাজধানী হওয়ার পরপরই জনসংখ্যার চিত্র আমূল পাল্টে যায়। ঢাকার অবস্থান দেশের প্রায় মাঝখানে। দক্ষিণের পটুয়াখালী বা উত্তরের ঠাকুরগাঁও থেকে সহজে মানুষ ঢাকায় আসতে পারে।
ঢাকা দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পাঞ্চল, তৈরি পোশাকশিল্পের ৭৫ শতাংশ ঢাকা ও এর আশপাশে। বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র এই শহর। উন্নত চিকিৎসার স্থল ঢাকা। উচ্চশিক্ষার মূল কেন্দ্রও এই ঢাকা। দেশের অন্যান্য অঞ্চল বা বিভাগীয় শহরগুলো অবহেলিত পড়ে আছে। সেখানে কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এসব কারণ ঢাকাকে জনবহুল করে তুলেছে।
ঢাকার ওপর কি চাপ বাড়তেই থাকবে? এই চাপ কমানোর জন্য সরকারের কি কোনো পরিকল্পনা নেই, সারা দেশের মানুষ যেন কাজ পায়, কাজের জন্য যেন ঢাকায় আসতে না হয়, সে জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, উপকূলের জেলা বিশেষ করে পটুয়াখালী ও বরিশাল থেকে মানুষ বেশি ঢাকায় আসছে। এ জন্য পায়রাবন্দর করা হচ্ছে। কাছাকাছি শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। ওই এলাকার মানুষের কাজের সংস্থান হবে। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বহু মানুষকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের ঢাকায় আসা ঠেকাবে।
১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ঢাকা মেগাসিটি এলাকার জনসংখ্যা ছিল ৬৪ লাখ ৮৭ হাজার। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৭২ হাজারে। বছরে ৬ লাখ ২৯ হাজারের মতো মানুষ বাড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মেগাসিটিতে দিনে মানুষ বাড়ছে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি।
পৃথিবীর মেগাসিটিগুলোর মধ্যে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি ঢাকায়। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৩ হাজার ৫০০ মানুষ বাস করে। ঢাকার কাছাকাছি জনঘনত্ব ভারতের মুম্বাইয়ে, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩২ হাজার ৪০০। এরপর হংকংয়ে ২৬ হাজার ৪০০।ঢাকা কেবল একটি শহর নয়, এটি একটি জীবনপ্রবাহ। এখানে প্রতিদিনের সংগ্রাম, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার সাথে লড়াই করে চলে মানুষ। এই শহরকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, দরকার সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণ। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ, এবং দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গড়ে তোলাই হতে পারে টেকসই ঢাকার প্রথম ধাপ। পরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি নগর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত। এখনই সময় আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঢাকার জন্য সম্মিলিতভাবে ভাবতে হবে। কেননা, একটি শহর ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু ভবন নয়, ভেঙে পড়ে মানুষের আশা, গতি ও জীবনের মান। ঢাকা ঢাকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য রক্ষা করতে হবে, বাঁচাতে হবে এ শহরকে, প্রকৌশলী মো: হারুন অর রশিদ, সভাপতি -পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, বাংলাদেশ
Posted ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]