শনিবার ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

>>

প্রস্তাবিতঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নবযাত্রা শুভ হোক

ড.মোঃ এনায়েত হোসেন   |   সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট


রাজধানী ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর,২০২৫ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ প্রস্তাবিতঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশ করে। সাত দিনের মধ্যে অংশীজনের কাজ থেকে এই খসড়া অধ্যাদেশের উপর মতামত চাওয়া হয়।শিক্ষার্থীদের দাবীর মুখে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে একীভুত করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কলেজগুলো হলো,ঢাকা কলেজ,ইডেন মহিলা কলেজ,সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি কলেজ,সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা কয়েক বছর ধরে তাদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী করে আসছিল।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গতি পায়। এই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের নানা দাবি নিয়ে নিয়মিত রাজপথ কাপাতে শুরু করে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অনাকাঙ্খিত আচরণ তাদের মধ্যে আন্দোলনের উত্তাপ ছাড়ায। ঢাকা কলেজের গেটের সামনে শিক্ষার্থীদের বড় জমায়েত কর্তৃপক্ষের টরক নাড়াতে সাহায্য করে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পটভুমিতেই রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এই সাতটি সরকারি কলেজ নিয়ে পৃথক একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন [ইউ.জি.সি.] কর্তৃক গঠিত কমিটি প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ জুলাই ৩৬ বিশ্ববিদ্যায়’ হতে পারে মর্মে প্রস্তাব করে। ইউ.জি.সি কর্তৃক প্রস্তাবিত এই নাম শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সমালোচনা ও ভিন্ন মতের কারণে টেকেনি।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যঃ উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের সাথে সংগতি রক্ষা ও সমতা অর্জন এবং জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা, বিশেষ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান চর্চা, পঠন- পাঠনের সুযোগ সম্প্রসারণ ও ঢাকা মহানগরের সাতটি কলেজের ¯্নাতক ও ¯্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের শিক্ষারমান উন্নতিকরনের প্রয়োজনে এবং আলোচিত সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তমুকরণের লক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতা বলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি করেন। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ঢাকা মহানগরের সাতটি কলেজের অবকাঠামো ও ক্যাম্পাস স্থায়ীভাবে দিনের নিদিষ্ট সময়ের জন্য (দুপুর ০১ঃ০০ ঘটিকা হতে সন্ধা ০৭ঃ০০ ঘটিকা) ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতি,ধর্ম,বর্ণ, গোত্র,লিঙ্গ,জন্মস্থান বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সকল দেশী ও বিদেশি উপযুক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, জ্ঞানার্জন এবং ডিগ্রি সমাপনের পর সনদ প্রাপ্তির জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও ভৌত কাঠামোঃ সাতটি কলেজ ক্যাম্পাসকে চারটি স্কুল বা ফ্যাকাল্টি / অনুষদে বিভক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। স্কুল/ফ্যাকাল্টি বা অনুষদ ৪টি হলোঃ ক. স্কুল অব সাইন্সেস খ. স্কুল অব আর্টস এন্ড হিউমিনিটিজ গ. স্কুল অব বিজনেস স্টাডিজ ঘ. স্কুল অব ল এন্ড জাস্টিস। ক. স্কুল অব সাইন্সেস নামে অনুষদটি ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস, ইডেন মহিলা কলেজ ক্যাম্পাস ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। খ. স্কুল অব আর্টস এন্ড হিউম্যানিনিটিজ অনুষদটি সরকারি বাঙলা কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। গ. স্কুল অব বিজিনেস স্টাটিজ অনুষদটি সরকারি তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। ঘ. স্কুল অব ল এন্ড জাস্টিস অনুষদটি কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচালিত হবে। এই সাত কলেজের যে সব কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি যুক্ত আছে তা বহাল থাকবে।
এই প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৪ ধরনের কর্মচারী নিয়োজিত থাকবে। যথাঃ ক. উপাচার্য খ. উপউপাচার্য গ. ট্রেজারার ঘ. হেড অব স্কুল (অনুষদ প্রধান) ঙ. ডিসিপ্লিন কোর্ডিনেটর (বিভাগীয় প্রধান) চ. রেজিষ্টার ছ.পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জ. গ্রন্থাগারিক ঝ. প্রক্টর ঞ. সহকারি প্রক্টর ট. পরিচালক (অর্থ ও হিসাব)ঠ. পরিচালক( পরিকল্পনা ও উন্নয়ন)ড. প্রধান চিকিৎসক ঢ. সংবিধি দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী হিসেবে ঘোষিত অন্যান্য কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করবে। প্রতিটি একাডেমিক ক্যাম্পাসে দুজন করে সহকারি প্রক্টর (একজন পুরুষ, একজন নারী) নিয়োজিত থাকবেন।এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি হাইব্রিড পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে৩৫%-৪০% ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে এবংসকল পরীক্ষা সশশীরে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়।

প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে সাত কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তিনটি ধারায় বিভক্ত হয়ে আন্দোলনে নেমেছে।উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা চায় এ সাত কলেজের যে সব কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শাখা যুক্ত আছে, তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে। নারী শিক্ষার সংকোচন বা ইডেন মহিলা কলেজ এবং বদরুন্নেছা সরকারি কলেজে সহ শিক্ষা চালু করার মত কোন পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষকরা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পদ ছাড়তে চান না। আবার এসব কলেজ ছেড়ে ঢাকা শহরের বাইরে যেতে চান না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা চান এ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত বাস্তবায়ন। প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশের উপর মতামত আহবান করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও্ উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে পত্র জারি করা হয়েছে।অংশীজন এবং আন্দোলনকারী পক্ষগুলো তাদের মতামত উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। ইতিমধ্যে প্রস্তাবিত খসড়া অধ্যাদেশের উপর ৬ হাজারের বেশী মতামত- পরামর্শ জমা পগেছে। সকল অংশীজনের মতামত, আপত্তি- প্রস্তাব-পরামর্শ পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানে পৌছে প্রস্তাবিত ” ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি” র একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা গেলেই তা সবার জন্য মঙ্গল হবে।

১৯৯২ খ্রি. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার পর ¯্নাতক পাস কোর্স, ¯্নাতক সম্মান, ও ¯্নাতকোত্তর পাঠ দানকারী কলেজগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মুক্ত করাহয়। সেশনজট মুক্ত হয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশসহ যেউচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছিল, অল্প সময়ের মধ্যে সে প্রত্যাশা পুরণে ব্যর্থ হয়। শিক্ষার মান নিম্নগামী হতে শুরু করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি সনদধারী বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়। ২০১৪ খ্রি. ৩১ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষামন্ত্রণালয় পরিদর্শন কালে¯্নাতক (সম্মান) কোর্স পাঠদানকারী সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের অধিনে ন্যাস্ত করার নির্দেশ প্রদান করেন । ইউজিসি সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়গণ সাবেক প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে নিয়ে এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভেতরে ভেতরে এ বিকেন্দ্রীয়করণের বিরোধিতা শুরু করে। অভিযোগ পাওয়া যায় যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর হারুন অর রশিদ এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে প্রচন্ড প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। তিনি এ বিকেন্দ্রীয়করণের ফলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমে যাবার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। অবশেষে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ২০১৭ খ্রি. ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সম্মান রক্ষার্থে শেষ পর্যন্ত ঢাকা শহরের সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে অধিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

ঢাকা কলেজ,ইডেন মহিলা কলেজ,সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেছা সরকারি কলেজ,সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি মুক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যুক্ত করা হলে এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা খুশী হলেও স্বার্থান্বেষী একটি মহল সরকারের এ উদ্যোগে খুশী হতে পারেনি। শুরু হয় নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং এ উদ্যোগ ব্যর্থ করার অপচেষ্টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলপ্রকাশেদীর্ঘসুত্রীতাসহ চরম অবহেলার নানা অভিযোগ আসে সাত কলেজের শিক্ষক শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে।অপর দিকে এই সাত কলেজের শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষা গ্রহণসহ অতিরিক্ত কাজের ভার বহন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টির যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সাত কলেজকে অধিভুক্ত মুক্ত করে দেবার ঘোষণা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে আন্দোলনে নামে। ঢাকা মহানগরের এই সাত কলেজের ¯্নাতক-¯্নাতকোত্তর স্তরের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফসল এই প্রস্তাবিত ” ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি”। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জুলাই যোদ্ধাদের একটি বড় অর্জন। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করলে উচ্চ শিক্ষা প্রসারে রাজধানীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পতা অনেকখানী লাঘব করবে। প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অতিদ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করবে জাতি প্রত্যাশা করে।

Facebook Comments Box

Posted ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

dainikbanglarnabokantha.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক

রুমাজ্জল হোসেন রুবেল

বাণিজ্যিক কার্যালয় :

১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

design and development by : webnewsdesign.com

nilüfer escort coin master free spins