কামরুল হাসান জীবন, নওগাঁ
মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬ প্রিন্ট
নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩ বছরের শিশু নাঈম ও ৫ বছরের শিশু আরাফাতের চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার ১০ মাস পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বিনোদপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে নিহত শিশু নাঈমের অবয়ব সিআইডি ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে তোলা হয়।
এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবারের দাবি, এটি কোনো সাধারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু নয়; বরং এক পৈশাচিক ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এক কিশোরীকে ধর্ষণের লোমহর্ষক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চরম প্রতিশোধ নিতেই এই নিষ্পাপ দুই শিশুকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বীজ বোনা হয়েছিল গত বছরের ১৬ জুলাই। ওইদিন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশরুমে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে বখাটেরা। সেই পৈশাচিক দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে নিহত নাঈমের বড় ভাই নাহিদ ইসলাম সাগর। পরবর্তীতে ভিডিওটি এলাকায় ভাইরাল হয়ে পড়লে ফেঁসে যায় অভিযুক্ত ধর্ষক ও তাদের পেছনে থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র। এতে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে সাগরের পরিবারকে এলাকাছাড়া করার পাশাপাশি ‘দেখে নেওয়ার’ অনবরত হুমকি দিয়ে আসছিল তারা।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, পূর্ব শত্রুতা ও হুমকির ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সকালে নাঈম ও তার খেলার সাথি প্রতিবেশী শিশু আরাফাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে যায় খুনিরা। এরপর তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে পাশের একটি পুকুরে লাশ ফেলে দেওয়া হয়।
স্বজনরা জানান, নাঈমের গলায় স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাছাড়া পানিতে ডুবে মারা গেলে পেটে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, তা পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ভেজা প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় তড়িঘড়ি করে এলাকা ছাড়তে দেখা গেছে, যা এই খুনের তত্ত্বকে আরও জোরালো করে।ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর স্থানীয় থানায় বারবার ধরণা দিয়েও কোনো সহযোগিতা মেলেনি। প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করায় বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তারা। বর্তমানে আদালতে এ সংক্রান্ত ৯০৪ নম্বর একটি মামলা বিচারাধীন। প্রথমে মামলাটি পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত করলেও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ দিনেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা একটি ‘মনগড়া ও একপেশে’ প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালতে নারাজি আবেদন দেন মামলার বাদী। এরই প্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
আজ মঙ্গলবার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শাহ মো. রাশেদ, সিআইডি, থানা পুলিশ এবং মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলনের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানহারা মা অশ্রুসিক্ত চোখে ও ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন,“আমার কলিজার টুকরাদের যারা মেরেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। আমরা গরিব মানুষ বলে কি আমাদের সন্তানের রক্তের দাম নেই? আমরা কি দেশে বিচার পাব না?”
গত ১৪ ও ১৫ মার্চ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই লোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে। তবে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরম ক্ষোভ ও শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। আজ লাশ উত্তোলনের পর পুরো এলাকায় নতুন করে তোলপাড় ও চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামবাসী ও নিহতের স্বজনেরা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
Posted ০৬:২০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]