নাজমুল হাসান শুভ, দাগনভূঞা (ফেনী) প্রতিনিধি:
শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০২৩ প্রিন্ট
‘বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই, ‘কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই’ এই কবিতা কার না মনে পড়ে, কিন্তু কালের বিবর্তনে বিলীন হতে বসেছে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার গ্রামগঞ্জে খড় দিয়ে বানানো তালগাছ হতে বাবুই পাখির বাসা। যেখানে সর্বদা একসময় বাবুই পাখির কলতানে মুখরিত থাকতো বিভিন্ন গ্রাম। তালগাছ নিধনের ফলে বাসা হারিয়ে বিলীনের পথে বাবুই পাখি।
জানা যায়, একটা সময় গ্রাম-বাংলার মাঠের ধারে, পুকুর পাড়ে কিংবা মাঠের পাশে দেখা মিলতো সারি সারি তালগাছের। সেখানে সাদা চঞ্চল নিষ্ঠাবান বুনন শিল্পী পাখির বাসাও কারো নজর এড়াতো না। সেই তালগাছ আর বাবুই পাখির বাসা দুটোই আজ হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলা থেকে। তেমনি হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাকৃতিক শিল্পীর পাখি ভোরবেলা কিচিরমিচির মধুর সুরে ডাকাডাকি আর উড়োউড়ি। গ্রামগঞ্জে, এমনকি শহরতলীতেও অনেক তালগাছ দেখা যেতো। সেসব তালগাছে ঝুলে থাকতো হাওয়ায় দোদুল্যমান বাবুই পাখির বাসা। একসাথে দশটি, বিশটি বাসা ঝুলে থাকতে দেখা যেতো তালগাছগুলোতে। তবে এগুলো এখন অতীত চিত্র। বর্তমানে না দেখা যায় তালগাছ, না দেখা যায় তালগাছে ঝুলন্ত বাবুইয়ের বাসা। শুধু তালগাছ নয়, নারকেল, সুপারিসহ নানান দীর্ঘ বৃক্ষই বাসা বাঁধে বাবুই। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এসব গাছ কমে যাওয়ায় আবাসন নিয়ে চরম সংকট পড়েছে এই পাখি। বাবুই পাখিদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে- ঘাস, বীজ, খাদ্যশস্য ও পোকা-মাকড়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় বাবুই পাখিকে বাসা তৈরি করতে দেখা গেছে কলা গাছে, সাধারণ ঝোপঝাড়ে। আবাসন সংকটের মাঝে এসব জায়গায় বাবুই বাচ্চা জন্ম দেওয়ায় তা অনায়াসেই নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। যার ফলে চরম অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পড়েছে এই সময়ের বাবুই পাখি। ঝুঁকি জেনেও অনেকটা বাধ্য হয়েই যেন অনিরাপদ জায়গায় আবাস গড়ে তুলছে পাখিগুলো। ফলে নিমিষেই ঝড়ের কবলে কিংবা মানুষের হাতে মারা পড়ছে। নিপুণ কারিগর বলা হয় বাবুই পাখিকে। বাবুই পাখিরা সার্বিকভাবে ছোট হলেও তাদের জ্ঞান ভান্ডার রয়েছে প্রচুর। একসময় গ্রামাঞ্চলে অবাধ বিচরণ ছিল তাদের। সুরেলা শব্দের মন মাতানো কিচিরমিচির শব্দ আগের মতো এখন তেমন শোনা যায় না। বুদ্ধিমান বাবুই পাখি ও তাদের দৃষ্টিনন্দন বাসা ও দেখা যায় না এখন।
বয়োবৃন্ধদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাবুই পাখিটি খুবই বুদ্ধিমান। দেখতে ছোট হলেও বুদ্ধিতে সব পাখিকে হার মানায় বাবুই পাখি। ঘাস ও লতা পাতা দিয়ে তালগাছের মাথায় সুন্দর করে বাসা তৈরি করতে পারে বলে এদেরকে তাঁতি পাখি বলা হয়। নিপুণ কারিগর এই পাখি স্ত্রী-পুরুষ মিলে তাদের স্বপ্নের সংসার পাতে এবং তাতে ডিম পাড়ে বাচ্চা ফুটায়। তারা আরও বলেন, ছোট বেলায় দেখিছি পথের ধারে, বাড়ির আনাচে-কানাচে অনেক তাল গাছ দেখা যেত কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ তাল গাছ কেটে ফেলার ফলে আজ আর তাল গাছের মগডালে চির চেনা বাবুই পাখির বাসা নজরে পড়ে না। বৈরী আবহাওয়ার ফলে আজ তালগাছে বাবুইপাখির কলতান কমই শোনা যায়। তবে ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা এবং পাখপাখালির কোন বিকল্প নেই।
সিনিয়র সাংবাদিক আজাদ মালদার বলেন, বাবুই পাখির বাসা তৈরিকে স্বনির্ভরতার প্রতীক এবং নৈতিক শিক্ষা হিসেবে বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হলেও বর্তমান বাস্তবতার নিরীক্ষে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই হুমকির মুখে রয়েছে এই পাখি।”বাবুই পাখি তাল, নারিকেল, সুপারি, খেজুর ও বাবলা গাছে বাসা করে থাকে। তবে বাসা বাঁধার জন্য সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তালগাছ। কিন্তু তালগাছ কেটে তাদের আবাসন আমরা ইতোমধ্যেই নষ্ট করে ফেলেছি। তিনি আরো বলেন, অতি লোভে আমরা তাল গাছ কেটে অন্য গাছ লাগাচ্ছি। তার ওপর কিছু কুসংস্কার আছে। গ্রামের মানুষ মনে করে তাল গাছে ভুত বাসা বাঁধে। আর সে ধারণা থেকেও অনেক তালগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। জ্ঞানের অভাবে টাকার লোভে আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করে চলেছি।”বাবুই পাখির জন্য আমাদের তাল গাছ রক্ষা করতে হবে। প্রকৃতির এই শিক্ষককে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মহিউদ্দিন মজুমদার জানান, অত্র অঞ্চলে পুরাতন তালগাছগুলোকে না কাটার জন্য এবং নতুনভাবে তালগাছের চারা উৎপাদন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে ও বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে তালগাছের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিলুপ্ত হওয়া নিপুন বাবুই পাখি অস্তিত্ব ও রক্ষা পাবে। আসুন সবাই মিলে তালগাছ লাগাই পরিবেশ রক্ষা করি।
Posted ০৯:১৭ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ১১ আগস্ট ২০২৩
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]