আকতার জামিল
মঙ্গলবার, ০১ জুন ২০২১ প্রিন্ট
মহাভারতে পান্ডুর পাঁচ পুত্রের কথা বলা আছে।যাদেরকে আমরা পঞ্চপান্ডব বলে জানি। এরা হলেন যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। এর মধ্যে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুন হচ্ছেন কুন্তীর সন্তান এবং নকুল ও সহদেব হলেন মাদ্রীর সন্তান। যদিও এ পাঁচ পুত্রের কেহই পান্ডুর ঔরসজাত সন্তান নন, তারা দেবশক্তিতে ভূমিষ্ঠ হন। আর দ্রৌপদী পঞ্চপান্ডবদের স্ত্রী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবরা হেরে যায় এবং পান্ডবরা জয়ী হন। পান্ডবরা প্রায় ৩৫ বছরেরও বেশী সময় ধরে হস্তিনাপুর শাসন করেন। কিন্তু কৃষ্ণের মৃত্যুর পর পান্ডবরা হতাশ হয়ে পড়েন। তখন অর্জুন বেদব্যাসের মুখোমুখি হন।
বেদব্যাস পান্ডবদের সিংহাসন ত্যাগ করতে এবং বানপ্রস্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পরামর্শ দেন। বানপ্রস্ত হলো সংসার জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মোক্ষ বা আধ্যাত্মিক মুক্তির উপর অধিক জোর দেয়া। পান্ডবরা পরিক্ষীতকে হস্তিনাপুরে সিংহাসনে বসিয়ে তীর্থ যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পান্ডবরা বিশ্বাস করতেন যে, তারা ভালো শাসক ছিলেন। তারা ধর্ম অনুসরণ করে চলতেন এবং তাদের সমস্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন। সুতরাং তারা অবশ্যই স্বশরীরে স্বর্গে স্থান পাবেন। দ্রৌপদীসহ পান্ডবগণ স্বর্গে পৌঁছার অভিপ্রায় নিয়ে বিভিন্ন তীর্থ স্থান ভ্রমণ করেন এবং হিমালয় পর্বত পরিদর্শন করেন। যে পর্বের চূড়া স্বর্গের প্রবেশদ্বার বলে মনে করা হয় তারা স্বর্গে পৌঁছানোর জন্য সে পর্বতে আরোহন শুরু করেন। তাদের সাথে একটি কুকুরও ছিলো। পর্বত আহোরণ করতে করতে প্রথমে দ্রৌপদী পড়ে যান। পঞ্চপান্ডবের একজন অর্জুন অপর পান্ডব যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞাসা করেন দ্রৌপদী কেনো পড়ে যাচ্ছেন? যুদ্ধিষ্ঠির উত্তর দিয়েছিলেন দ্রৌপদী অন্য স্বামীদের তুলনায় অর্জুনকে বেশী ভালোবাসতেন। এরপর দ্রৌপদী পড়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন।
পরবর্তীতে আরেক পান্ডব সহদেব পড়ে যান। এরপর অন্য পান্ডব ভীম সহদেবের পড়ে যাবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। যুধিষ্ঠির বলেন সহদেব তার জ্ঞান নিয়ে খুব গর্বিত ছিলেন। ফলে সেও স্বর্গে যাবার আগে মারা যান। পরবর্তীতে আরেক পান্ডব নকুলও পড়ে যান। কারণ জানতে চাইলে ভীমকে যুধিষ্ঠির বলেন যে নকুল তার সৌন্দর্য নিয়ে গর্বিত ছিলেন। তিনিও পড়ে যেয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর অর্জুনও পড়ে যান। অর্জুনের পড়ে যাবার কারণ জানতে চাইলে ভীমের প্রশ্নে যুধিষ্ঠির বলেন যে, অর্জুন তার ধনুকের দক্ষতায় পৃথিবীর সেরা যোদ্ধা হিসেবে খুব গর্বিত ছিলেন। এ কারণেই পড়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে ভীম নিজেই পড়ে যান। তিনি যুধিষ্ঠিরকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন, উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেন যে, তিনি নিজে বেশী খান, কিন্তু অন্যের ক্ষুধার কথা ভাবেন না। এভাবে ভীমও পড়ে মারা যান। এভাবে পাঁচজন স্বশরীরে স্বর্গে যেতে পারেন না। কেবল যুধিষ্ঠির ও কুকুরটি যাত্রাপথে শীর্ষে পৌঁছেছিলেন।
সেখানে তারা ভগবান ইন্দ্রকে সোনার রথে অপেক্ষা করতে দেখেন। যুধিষ্ঠির কুকরটিকেও প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইন্দ্রকে অনুরোধ করেন। কারণ কুকরটি তার দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গী ছিলেন। ইন্দ্র তার দাবী অস্বীকার করেন এবং যুধিষ্ঠিরকে কুকরটিকে রেখে রথে উঠতে বলেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির তাতে রাজী হননি। তখন ইন্দ্র তার নীতিগত অবস্থান দেখে সন্তুষ্ঠ হয়ে বলেন আপনি আবারও আপনার সততা প্রদর্শন করেছেন এবং স্বর্গে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তার সাথে যে কুকুরটি ছিলো সেটি ছিলো আসলে ধর্মের দেবতা। ধর্মের দেবতা যুধিষ্ঠিরের গুণের খুব প্রশংসা করেন। ইন্দ্র যুধিষ্ঠিরকে তার রথে করে স্বর্গে নিয়ে যান। এভাবে যুধিষ্ঠির তার সততা ও ন্যায়ের মাধ্যমে স্বশরীরে স্বর্গে প্রবেশ করেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার ক্রোধ, লোভ, বিদ্বেষ, ঘৃণা, অহংকার ইত্যাদি পরিত্যাগ করতে না পারবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি স্বর্গের দেখা পাবেন না। ইসলাম ধর্মের বহু স্থানেও অংহকারকে ত্যাগ করতে বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যার অন্তরে তিল পরিমাণ অহংকার থাকবে; সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (তিরমিজি)। কুরআন এবং হাদিসে অহংকারকে ‘উম্মুল আমরাজ’ বা সব রোগের জননী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত আদম আলাইহিস সাল্লামকে সৃষ্টি করে আল্লাহ সব ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদমকে সেজদা করার জন্য। সবাই তার নির্দেশ মেনে নিলেও শয়তান অহংকারবশত: সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানায়। আল্লাহ বলেন- ‘সে অস্বীকৃতি জানাল এবং অহংকার করল। আর সে কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ৩৪)। সৃষ্টিকর্তা কোনো অহংকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘দুনিয়াতে যারা অন্যায়ভাবে অহংকার প্রকাশ করে, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার নিদর্শনাবলী থেকে বিমুখ রাখবো।’ (সুরা আরাফ : আয়াত ১৪৬)। সুরা নাহলে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’
(সূরা : নাহল, আয়াত : ২৩)। সুরা আন নিসায় বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন লোককে পছন্দ করেন না, যে বড় হওয়ার গৌরব করে ও অহংকার করে। ’ (আয়াতঃ ৩৬)। কুরআনে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে কথা বলো না এবং পৃথিবীতে গর্বের সঙ্গে চলবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বড়াইকারী ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না। ’ (সুরা লোকমান: ১৮)। হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘অহংকারী ও অহংকারের মিথ্যা ভানকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। ’ -সুনানে আবু দাউদ। কুরআনে আরও এসেছে, ‘এমন কত জনপদ আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, সেখানকার লোকেরা ধন-সম্পদের অহংকার করত। এই যে তাদের বাড়িঘর পড়ে আছে, যেখানে তাদের পর কম লোকই বসবাস করেছে। শেষ পর্যন্ত আমি (এ সবেরই) ওয়ারিশ হয়েছি। ’ -সুরা আল কাসাস: ৫৮। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘একদা এক ব্যক্তি এক জোড়া জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে (রাস্তা দিয়ে) চলছিল। তা নিয়ে তার খুব গর্ব বোধ হচ্ছিল। তার জমকালো লম্বা চুলগুলো সে খুব যত্নসহকারে আঁচড়ে রেখেছিল।
হঠাৎ আল্লাহ তাআলা তাকে ভূমিতে ধসিয়ে দেন এবং সে কিয়ামত পর্যন্ত এভাবেই নিচের দিকে নামতে থাকবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৭৮৯)। রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘জাহান্নাম ও জান্নাত পরস্পর তর্ক করছিলো। জাহান্নাম বলল, আমাকে দাম্ভিক ও অহংকারী মানুষ দেওয়া হয়েছে, যা তোমাকে দেওয়া হয়নি। জান্নাত বলল, আমার কী দোষ যে দুর্বল, অক্ষম ও গুরুত্বহীন মানুষগুলোই আমার ভেতর প্রবেশ করছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮৪৬)। খ্রীস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের হিতোপদেশের বিভিন্ন পদে অহংকারকে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন হিতোপদেশ ৮:১৩ পদ বলে, “অহঙ্কার, দাম্ভিকতা ও কুপথ, এবং কুটিল মুখও আমি ঘৃণা করি।” হিতোপদেশ ১৬:৫ পদ বলে, “যে কেহ হৃদয়ে গর্ব্বিত, সে সদাপ্রভুর ঘৃণাস্পদ।” ১৮ পদ নির্দেশ করে,“বিনাশের পূর্ব্বে অহঙ্কার, পতনের পূর্ব্বে মনের গর্ব্ব।” এছাড়া হিতোপদেশ ২৯:২৩ বলে, “মনুষ্যের অহংকার তাহাকে নীচে নামাইবে, কিন্তু নম্রচিত্ত ব্যক্তি সম্মান পাইবে।”
বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক গৌতম বুদ্ধও ক্রোধ সংবরণ এবং অহংকার পরিত্যাগ করার কথা বলেছেন। এভাবে প্রতিটি ধর্মেই অহমিকা, গর্ব, দাম্ভিকতা, অহংকার ইত্যাদিকে অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বস্তুতঃ মানুষ যে ধর্মেরই হোক না কেনো স্বর্গযাত্রা করতে হলে বা জান্নাতে যেতে হলে কিংবা পরকালে চূড়ান্ত সফলতা পেতে হলে অবশ্যই আমাদের সকলকে ক্রোধ, লোভ, বিদ্বেষ, ঘৃণা, অহংকার ইত্যাদি পরিত্যাগ করতে হবে। লেখকঃ উপ-ভূমি সংস্কার কমিশনার (উপসচিব), বরিশাল বিভাগ
Posted ০৯:২৯ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০১ জুন ২০২১
dainikbanglarnabokantha.com | Romazzal Hossain Robel
১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮
ই-মেইল: [email protected]