শুক্রবার ১০ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের চাপে আত্মসমর্পণ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সদস্যের

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬   প্রিন্ট  

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের চাপে আত্মসমর্পণ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৩ সদস্যের

‎‎সুন্দরবনে দীর্ঘদিনের ত্রাস সৃষ্টিকারী বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।

‎সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তারকারী দস্যু বাহিনী বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সক্রিয় সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে মোংলা কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তরে আত্মসমর্পণ করা এই দস্যুরা হলেন আল আমিন হোসেন, তৈবুর রহমান এবং মনিরুজ্জামান ওরফে মামুন। তাদের সাথে জিম্মি থাকা একজন জেলেকেও উদ্ধার করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের বিসিজিএস কামরুজ্জামানের নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মো. মানসুরুন মাহ্‌দীন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অভিযানে তাদের কাছ থেকে দুটি দেশীয় একনলা বন্দুক, একটি দেশীয় পাইপগান এবং ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্ট গার্ডের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি এবং ধারাবাহিক অভিযানের মুখে কোণঠাসা হয়েই তারা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার লক্ষ্যে চলমান বিশেষ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এটি একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‎আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে সুন্দরবনের জেলে ও বাওয়ালীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, এই বাহিনীটি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টহল দিয়ে মাছ ধরার নৌকায় আক্রমণ চালাত এবং অর্থ আদায় না হওয়া পর্যন্ত জেলেদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ভুক্তভোগী জেলেদের দাবি অনুযায়ী, এই চক্রের সদস্যরা শুধু মুক্তিপণ আদায়ই নয়, বরং বাওয়ালীদের নিয়মিত চাঁদা দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রেখেছিল। দস্যু বাহিনীর এমন ত্রাসের কারণে স্থানীয় বনজীবীরা চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছিলেন। উদ্ধার হওয়া জিম্মি জেলের জবানবন্দি অনুযায়ী, দস্যুরা তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গভীর বনে নিয়ে যেত এবং মুক্তিপণের জন্য পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। এই বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কোস্ট গার্ডের ক্রমাগত চাপের ফলে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ায় তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সুন্দরবনে দস্যুতা নির্মূলে পরিচালিত ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামক দুটি বিশেষ অভিযানের সফলতা দৃশ্যমান হচ্ছে। কমান্ডার মো. মানসুরুন মাহ্‌দীন জানান, দস্যু চক্রের নেটওয়ার্ক ভাঙতে কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা শাখা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের আইনি প্রক্রিয়ায় পুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর আগে গত ২১ মে ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্যের আত্মসমর্পণের ঘটনা সুন্দরবনে দস্যুতা দমনে কোস্ট গার্ডের সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ধরনের আপস করা হবে না এবং যারা এখনও দস্যুতার সাথে জড়িত, তাদের অতি দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় কঠোর সামরিক ও আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের তরফ থেকে।

‎সুন্দরবনের দস্যুমুক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়া বননির্ভর অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যটন শিল্প এবং মৎস্য আহরণ ব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে এই ধরনের অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দস্যুতা পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে কেবল আত্মসমর্পণই যথেষ্ট নয়, বরং বনের অভ্যন্তরে নিয়মিত টহল ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সুন্দরবনকে পুনরায় নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত করার যে লড়াই কোস্ট গার্ড শুরু করেছে, তার চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে দস্যু চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার ওপর। দস্যুমুক্ত সুন্দরবন নিশ্চিত করা গেলে বাওয়ালী ও জেলেদের ভয়হীন জীবিকা অর্জনের পথ প্রশস্ত হবে, যা সামগ্রিকভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

Facebook Comments Box

Posted ০৫:০৭ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

dainikbanglarnabokantha.com |

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১
সম্পাদক : রুমাজ্জল হোসেন রুবেল
বাণিজ্যিক কার্যালয়

১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮

ই-মেইল: [email protected]