• শিরোনাম

    সেতু উদ্বোধনের আনন্দের সাথে রয়েছে, পেশা বদলের দুশ্চিন্তা

    মিজানুর রহমান মোস্তফা,শরীয়তপুর ॥ | মঙ্গলবার, ২১ জুন ২০২২ | পড়া হয়েছে 31 বার

    সেতু উদ্বোধনের আনন্দের সাথে রয়েছে, পেশা বদলের দুশ্চিন্তা
    apps

    স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আর মাত্র ৫ দিন বাকি।আর এতে করে দক্ষিন পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের আনন্দোল্লাসের যেন শেষ নেই। পদ্মারপাড়ে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার উৎসুক মানুষ ভিড় করছে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর সৌন্দর্য দেখতে। দুর থেকেই তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। মুহুর্তটি স্মরনীয় করে রাখতে অনেকেই ছবি তোলেন।
    তবে শরীয়তপুরের জাজিরা মঙ্গলমাঝি ঘাটের লঞ্চঘাটের লঞ্চমালিক, সি-বোড, ট্রলার মালিক, লঞ্চ কর্মচারী ও লঞ্চঘাটের ব্যবসায়ীরাসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের চোখে মুখে দেখা যাচ্ছে হতাশার ছাপ। কারন পদ্মা সেতু চালু হলে মানুষের লঞ্চে পারাপার হতে হবে না। সরাসরি বাস ও অন্যান্য গাড়ীতে পদ্মা সেতু দিয়ে পদ্মানদী পাড় হতে পারবে এ পথের সাধারণ যাত্রীরা।
    আর যেহেতু তারা এ পথে আসা যাত্রীদের উপর নির্ভর করেই বিভিন্ন ব্যাবসা-বাণিজ্য কিংবা ছোট-খাটো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন তার ভবিষ্যৎ এখন সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যার ফলে এই ধরনের মানুষগুলো রয়েছে অত্যন্ত দুশ্চিন্তায়।
    মঙ্গলমাঝির লঞ্চঘাটে সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলমাঝি লঞ্চঘাটটি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নে অবস্থিত। যা ১৯৯১ সালে আংশিকভাবে ঘাটটি প্রাথমিকভাবে স্থাপিত হলেও ১৯৯৯ সালে চুড়ান্তভাবে ঘাটটি চালু হয়। যদিও ১৯৮৪ সালে ঘাট স্থাপনের প্রাথমিক চেষ্টা হিসেবে ঘাটটির নামকরণ করা হয় মঙ্গলমাঝির লঞ্চঘাট নামে।
    জাজিরার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের এই অঞ্চলে ০৯ টি ওয়ার্ড ও প্রায় ৩৬ টি গ্রামে প্রায় ৩৩,০০০ মানুষের বসবাস। যার শতকরা ৪০% মানুষ লঞ্চঘাটে ব্যবসা করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। লঞ্চঘাটের আশেপাশে ও ঘাট সংলগ্ল বাজারটিতে প্রায় ২০০ টিরও বেশি বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান রয়েছে।
    যার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য রয়েছে খাবারের হোটেল, চায়ের দোকান, ফলের দোকান, মুদি দোকান, মিষ্টির দোকান। এছাড়াও রয়েছে ভাসমান কিছু মুখরোচক খাবারের ভ্রাম্যমাণ দোকান। যারা মঙ্গলমাঝি লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে কেউ এক যুগ আবার কেউ দুই যুগ যাবত জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। যার মধ্যে প্রায় ২০% ব্যবসায়ীরা এই উপার্জনে নিজেদের পরিবারের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার নির্বাহ করে থাকেন।

    কালু মিয়া পেশায় একজন কুলি। যিনি প্রায় ১২ বছর যাবত লঞ্চঘাটে যাত্রীদের ভারী বোঝা, ব্যাগ, ট্রলি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে দেন। তার বিনিময়ে যাত্রীরা যা বকশিস দেন সেটাই তার রোজগারের একমাত্র মাধ্যম তিনি জানান, তার পরিবারের ৫ জন সদস্য তার উপর নির্ভরশীল। এমতাবস্থায় তার জীবিকা বন্ধের পথে, তাই সে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।
    এছাড়া মঙ্গলমাঝি লঞ্চঘাটে সরেজমিনে বিভিন্ন জায়গায় ও বিভিন্ন লঞ্চে ঘুড়ে দেখা যায়, জীবিকার তাগিদে অনেজ মানুষই হেঁটে হেঁটে লঞ্চে যাত্রীদের কাছে বিভিন্ন মুখোরোচক খাবার ও পানিয় বিক্রি করে যাচ্ছেন। তাতে যা আয় হচ্ছে তা দিয়েই নাকি চলছে তাদের সংসার।
    ঝালমুড়ি বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ১৭ বছর যাবত এই লঞ্চঘাটে ঝালমুড়ি বিক্রি করে নিজের সংসার চালাচ্ছি। পদ্মা সেতু চালু হয়ে গেলে তখন আর এই ঘাটে এত মানুষের আসা-যাওয়া থাকবেনা। যার ফলে আমাদের বেচা-বিক্রিও আর হবে না। ভিটে-মাটি ছাড়া আমার আর অতিরিক্ত জমিও নেই যে চাষাবাদ করে খাবো। সরকার যদি আমাদের রোজগারের স্থায়ী একটা ব্যবস্থা করে দিতো তাইলে হয়তো বউ পোলাপান নিয়া খাইয়া-পইড়া বাইচা থাকতে পারতাম।
    হোটেল ব্যবসায়ী শাহ আলম মাদবর জানান, জমিজমা বেইচা খাওনের হোটেল দিছি। ব্যবসা ভালোই চলতাছিল। এহন পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরে এইহান দিয়া মানুষের চলাচল কমে যাবে। মনে হচ্ছে ব্যবসাটা বেশীদিন চালাইতে পারমু না। আমার সংসারতো বিপদে পড়বেই তার উপরে আমার হোটেলে প্রায় ৭-৮জন কর্মচারী রয়েছে তাদেরই বা কি হবে। একইভাবে তার হোটেল কর্মচারী সুজন শেখ নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন।
    মেসার্স নিতি নিধি নেভিগেশন কোং লঞ্চের মালিক আতাহার বেপারী ও এই রুটের লঞ্চ মালিক সমতির সভাপতি আতাহার বেপারী জানান, “পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে ভালো ব্যাপার। মানুষের দুর্ভোগ কমবে। কিন্তু আমরা যারা লঞ্চ মালিক, লঞ্চের অন্যান্য স্টাফ আছি আমাদের আয় এক প্রকার বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আশা করি সরকার আমাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন”।
    একই লঞ্চের মালিক মোঃ সারওয়ার হোসেন জানান, এই লঞ্চ চালিয়েই আমরা আমাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। এখন সেতু চালু হলে যাত্রী আসবে না, তাই লঞ্চও বন্ধ হয়ে যাবে। বাধ্য হয়েই আমাদের পেশা বদল করতে হবে হয়তো।

    মঙ্গলমাঝীর লঞ্চঘাটের ইনচার্জ আব্দুল্লাহ এনাম বলেন, লঞ্চ বন্ধের বিষয়ে এখনও আমরা কোন নির্দেশনা পাইনি। মনে হয় কোন নির্দেশনা আসবেও না, হয়তো সেতু চালু হলে যাত্রী থাকবে না। তখন বাধ্য হয়েই লঞ্চ মালিকরা তাদের লঞ্চগুলো আর এই রুটে চালাবেন, কিংবা কেউ বিক্রি করে দিবেন এটাই স্বাভাবিক।

     

    বাংলাদেশ সময়: ৯:৫২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২১ জুন ২০২২

    dainikbanglarnabokantha.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ