মঙ্গলবার ১৮ জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৪ আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

>>

সাহিত্যে নোবেল লুইস গ্লিকের, উপকথা আর ধ্রুপদি মিথের কবিতার জয়

  |   শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২০   |   প্রিন্ট

সাহিত্যে নোবেল লুইস গ্লিকের, উপকথা আর ধ্রুপদি মিথের কবিতার জয়

সাব্বির খান, সুইডেন থেকে: নোবেল কমিটির মতে, তাঁর অসামান্য কাব্যভাষা ও দার্শনিক সৌন্দর্যবোধ ব্যক্তির অস্তিত্বকে সর্বজনীন করে তোলে। তাঁর কবিতা যেন আত্মজৈবনিকতার সঙ্গে ধ্রুপদি মিথের গূঢ় আন্ত সম্পর্ক। পৌরাণিক কাহিনি বা উপকথা থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার ছাপ রয়েছে তাঁর কবিতায়। মানবজীবনের বিভিন্ন সংকট, অভীপ্সা, প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতা তাঁর কবিতার অন্যতম লক্ষণ। তিনিই মার্কিন কবি লুইস গ্লিক; ৭৭ বছর বয়সী এই কবি এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

 

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় স্টকহোমের দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি ম্যাটস মাল্ম সাহিত্যে নোবেলজয়ী হিসেবে লুইস গ্লিকের নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, লুইস গ্লিকের বেশির ভাগ রচনাই উপকথা ও ধ্রুপদি মিথের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর কাব্য এককের সঙ্গে বিশ্বজনীনতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

 

লুইস গ্লিক সম্পর্কে সুইডিশ একাডেমির চেয়ারম্যান আন্ডেরস উলসন বলেন, গ্লিকের কাব্যিক উচ্চারণ মধুর ও আপসহীন। তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি নিজেকে প্রাঞ্জল করতে সচেষ্ট।

 

একই সঙ্গে তাঁর লেখায় পাওয়া যায় হাস্যরস ও তীক্ষ কৌতুকের সংমিশ্রণও। যদিও তাঁর বেশির ভাগ কবিতায়ই আত্মজীবনীমূলক প্রেক্ষিত ফুটে ওঠে, কিন্তু তাঁকে কিছুতেই স্বগোতোক্তি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তিনি সর্বজনীনতাকে ধরতে চান কবিতায়।

 

লুইস গ্লিকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে; তিনি বেড়ে ওঠেন নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে। ১৯৬৮ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফার্স্টবর্ন’ প্রকাশের মধ্য দিয়েই কবি হিসেবে আলোচনায় আসেন। খুব অল্প সময়েই মার্কিন সমকালীন সাহিত্য জগতে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করতে সমর্থ হন তিনি। তাঁর ১২টি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রবন্ধগ্রন্থও বেরিয়েছে। তাঁর অন্যতম প্রশংসিত বইগুলোর একটি ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ (১৯৯২)। এই বইয়ে তিনি ‘স্নোড্রপস’ বা ‘তুষার ফোঁটা’ শিরোনামের একটি কবিতায় শীতের পরে মানবজীবনের অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের যে স্বপ্নিল বর্ণনা দিয়েছেন, তা পাঠকের হূদয় ও চিন্তার জগতকে আলোড়িত করে। ২০০৬ সালে লেখা তাঁর ‘আভেরনো’ও দুর্দান্ত একটি বই; যেখানে মাদার দেবতার বংশোদ্ভূত হেডেসের বন্দিদশায় বসন্তের দেবী পার্সেফোনের এক কল্পিত মিথের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ফেথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’।

 

লুইস গ্লিকের রচনায় অনেকে রাইনের মারিয়া রিলকে এবং এমিলি ডিকিনসনের উত্তরাধিকারকে খুঁজে পান। সেদিক থেকে দেখলে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের মূল ধারার কবিতা থেকে নিজেকে খুব বেশি বিচ্ছিন্ন করেননি। গবেষকদের মতে, তিনি জীবন ও মৃত্যুর শাশ্বত রহস্য আর প্রকৃতির অনিঃশেষ রহস্যময়তাকেই বেশি করে ধরতে চান কবিতায়।

 

নোবেল পুরস্কারের এক শ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে এর আগে মাত্র ১৫ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন; এ তালিকায় গ্লিক ১৬তম। অনেকেই তাঁকে ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাইলেও তিনি নিজে এ অভিধা গ্রহণে নারাজ। নিজের লেখা প্রবন্ধে এ বিষয়ের ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন।

 

লুইস গ্লিক বর্তমানে বাস করছেন ম্যাসাচুসেটসের কেমব্রিজ শহরে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন। ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি পুলিত্জার পুরস্কার পান। তাঁর কাব্যসংগ্রহ ‘পোয়েমস ১৯৬২-২০১২’-এর জন্য ২০১২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৪ সালে ‘ফেথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’ কাব্যগ্রন্থের জন্য জাতীয় সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। লেখালেখির বাইরে তিনি কানেকটিকাটের নিউ হেভেনের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

 

নোবেলজয়ী লুইস গ্লিককে সম্মাননা হিসেবে একটি স্বর্ণপদক, নোবেল মানপত্র এবং ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার দেওয়া হবে। প্রথানুযায়ী, আগামী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কারের জনক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোমে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুইডেনের রাজা কার্ল গুস্তফ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও কভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছর সব অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বর নোবেল বিজয়ীরা তাঁদের নিজ নিজ দেশের সুইডিশ দূতাবাসে অথবা কর্মস্থল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ‘ভার্চুয়াল নোবেল পুরস্কার বিতরণ’ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তবে ২০২১ সালের নোবেল পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হবে বলে কমিটির চেয়ারম্যান আন্ডেরস উলসন জানান। আজ শুক্রবার নরওয়ের অসলো থেকে শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।

Facebook Comments Box

Posted ১০:০১ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২০

dainikbanglarnabokantha.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক

রুমাজ্জল হোসেন রুবেল

বাণিজ্যিক কার্যালয় :

১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১০ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬

ই-মেইল: newsnabokantha@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

design and development by : webnewsdesign.com