• শিরোনাম

    ‘যোদ্ধাদের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাস কেউ ঘেঁটেও দেখে না’

    স্টাফ রিপোর্টার | বৃহস্পতিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | পড়া হয়েছে 38 বার

    ‘যোদ্ধাদের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাস কেউ ঘেঁটেও দেখে না’

    ‘যোদ্ধাদের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাস কেউ ঘেঁটেও দেখে না’

    apps

    বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. আবেদ আহমেদ শাহ, যুদ্ধকালীন কমান্ডার

    একবার মনে আছে, আমাদের রান্নাঘর ছিল বসত ঘর থেকে ২/৪ হাত দূরে। গ্রামের রান্নাঘরগুলো এমনই হয়, রান্নার সময়ে ধোয়া, মশলার ঝাজ ইত্যাদি যেন শোবার ঘরে না আসে, এজন্য একটু দূরে করা হয়। তো, একদিন বসত ঘরের চৌকি থেকে দেখলাম দুধ জ্বাল দেয়ার সময় কুলসুমের মা মুখে ফু দিয়ে দুধের ফেনা কমানোর চেষ্টা করছে। কুলসুমের মা আমাদের প্রতিবেশী, আম্মাজীর সাহায্যকারী, কিন্তু আমি কাজের লোকের হাতে সচরাচর কিছু খাই না, আমার সব কাজ আম্মাজী করে দিতেন। আমার শুচিবাই সম্পর্কে আম্মাজী ভাল মতই জানতেন। ক্লাস সিক্স থেকেই আমি পড়ার জন্য বাইরে বাইরে থাকতাম। মাঝেমধ্যে ছুটি ছাটা পেলে বাড়ি আসতাম। যতই বড় হয়েছি, এই শুচিবাইগ্রস্ততা বেড়েছে বৈ কমে নাই। ছোটবেলা থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে ছিলাম। এই অতিরুচিবাগীশ হওয়ার দরুন আম্মাজীকে বেশ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। পোষাক-পরিচ্ছদ যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার পরতাম, খাওয়ার প্লেট-গ্লাসের পরিচ্ছন্নতায় ছিলাম আরেক কাঠি সরেস।কুলসুমের মার উনুনে দুধের ফুলে ওঠা ফেনা কমানোর জন্য মুখে ‘ফু’ দেয়া দৃশ্য দেখে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম। চৌকি থেকে ওঠে গিয়ে দিলাম পাতিল বরাবর সজোরে এক লাথি।

    ছিঃ, আমি অপরিষ্কার একজনের মুখের ‘ফু’ দেয়া  দুধ খাবো? চিৎকার দিয়ে আম্মাজীকে ডাকছিলাম। আম্মাজী পুকুরঘাটে কাপড় ধুচ্ছিলেন। আমার ডাকাডাকিতে দৌঁড়ে এসে দেখেন দুধের ছড়াছড়ি রান্নাঘর জুড়ে, পাতিল এক কোণায় কাত হয়ে আছে। কুলসুমের মা খুঁজে পাচ্ছেন না, তাঁর কী অপরাধ হয়েছে, কেন আমি এমন করলাম। তিনি যে ক্ষুন্তি হাতে নাড়া দিচ্ছিলেন, সেটির দিকে একবার, চুলার দিকে একবার, আমার দিকে একবার ছলছল চোখে তাকাচ্ছিলেন। আমার আকস্মিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। আমার তখন আম্মাজীর উপর রাগ চরমে; অন্য লোকের ‘ফু’ দেয়া দুধ আমি খাবো! অসম্ভব। পুকুরঘাট থেকে আম্মাজী আসামাত্র “আপনি জানেন না, অন্যের হাতে ধুয়া প্লেটেও আমি কিছু খাই না?” বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম।দেশে তখন “আগুইন্না সংগ্রাম” চলে। কলেজ-স্কুলের ছাত্ররা ক্লাস ফেলে আন্দোলন-মিছিল করে। আমি তখন বিএ ক্লাসে কয়েকবার ড্রপ আউট। পড়তাম বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ কিলো দূরের এক কলেজে, সেখানেই কলেজ ছাত্রাবাসে থেকে ছাত্ররাজনীতি করতাম।

    আইয়ুবের সমর্থক বিডি মেম্বারদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর জন্য সারাদেশে তখন তুমুল আন্দোলন চলছে। এ সময় আমি এই আন্দোলন চাঙা করতে নিজের এলাকায় আসি। আম্মাজী অনেকদিন পর আমাকে পেয়ে বেশ খুশি ছিলেন। কিন্তু আকস্মিক এই ঘটনায় তিনি ভীষণ মর্মাহত হলেন।

    হাড়িতে উথলে ওঠা দুধে কুলসুমের মায়ের ‘ফু’ দেয়া যে দুধ আমি খেতে চাইনি বলে লাথি মেরে পাতিলসহ দুধ ফেলে দিয়েছিলাম, এর নির্মম জবাব আমি বছর দেড়েকের মধ্যেই পেয়েছিলাম। ৭ মার্চের ভাষণের পর সবকিছু অতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। এতোদিন রাজপথে মিছিল-মিটিং করেছি। ছয় দফার আদলে স্বাধিকার চেয়েছি। নির্বাচনে বিজয়ী দলের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর চেয়েছি। কিন্তু সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এবারের ডাক অন্যবারের থেকে আলাদা। এবারের আহবান সর্বনাশা! জীবন দেয়ার জন্য ডাক! স্বশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে বাঙালির ভাগ্য ফয়সালার ডাক। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের অম্পিনগর ক্যাম্পে আমরা প্রায় চার/পাঁচশ তরুণ জড়ো হয়েছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে। একেক শ্রেণি-পেশার সবাই আমরা, রুচি-পোষাকও আলাদা। আমি ছাত্রজীবন থেকে পাজামা-পাঞ্জাবি পড়তাম। কিন্তু যুদ্ধের ক্যাম্পে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গ্যাঞ্জি আমাদের এক শ্রেণিতে নামিয়ে আনে এতোগুলো মানুষের তিনবেলার খাবার ব্যবস্থা সহজ ছিল না। তার উপর ভারতে ক্যাম্পগুলো ছিলো টিলা-জঙ্গলের ভেতর। নিজেরা জঙ্গল-গাছপালা পরিষ্কার করে থাকার জায়গা বানিয়ে নিয়েছি। কীট-পতঙ্গ, সাপ, ব্যাঙ ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। পাহাড়ি মশার আকার ও কামড় আমার মতো নদী অঞ্চলের মানুষের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। আমাদের কতজন যে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে তার ঠিক নাই। খাবারদাবারের পানি সংগ্রহ করা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। পাহাড়ের টিলা থেকে নিচে নেমে শীর্ণ ঝর্ণা থেকে কোনমতে খাওয়ার পানিটুকু জোগাড় করতাম। মাথায় রাখতে হত, পাহাড়/জঙ্গলের পানির উপর মানুষের একক অধিকার নেই; এই জলের উপর জঙ্গলের অন্যান্য প্রাণীদের সমান অধিকার আছে। তাই, মাঝেমাঝে পানি সংগ্রহ করতে গেলে বন্যপ্রাণীদেরও দেখা পেতাম। পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক স্থান হয়ত বনের জলাধার! যাইহোক, সবচেয়ে ভয় ছিল, পানীয়জলের উজানে মরা পশু ভেসে থাকলে, এজন্য ক্যাম্পে প্রায়ই অনেকে কলেরা-ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হত। ট্রেনিংয়ে থাকাকালীন আমিও একবার ডায়রিয়ায় ভুগেছিলাম। এমনিতে লিকলিকে শরীর, তার উপর ডায়রিয়ায় মারাত্মক কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম। পানি রাখার মত জগ বা বোতল সেখানে ছিল না। আমরা দিনশেষে অস্ত্র-গুলাগুলি প্রশিক্ষণের পর খালি হওয়া গুলি রাখার লোহার বাক্স নিয়ে ঝর্ণা বা পানির উৎসের কাছে চলে যেতাম। হাত-মুখ, গোসল সেরে এটিতে পানি নিয়ে ওপরে চলে আসতাম। গুলির বাক্সে বড়জোর 4/5 লিটার পানি ধরত। এইটুকু পানি দিয়েই পরেরদিন পর্যন্ত আমাদের খাওয়া-প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম চালাতে হত। শীতকালে এইটুকু পানির ব্যবস্থা করা ছিল আরো কঠিন ব্যাপার। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সকালের খাবার হিসেবে দেয়া হত বড় এনামেলের মগে এক মগ চা আর দুইটা রুটি। কোন সবজি-ডিম-হালুয়ার ব্যবস্থা ছিল না। দুপুরবেলার খাবারে থাকত কালো কালো দানার খেসারির ডাল; তাও আস্ত-অচূর্ণ, আগেরদিন পানিতে ভিজিয়ে রাখত; পরেরদিন অঙ্কুরিত হয়ে যেত, এই অবস্থায়ই সামান্য লবণ-হলুদ-মরিচ মিশিয়ে পানি দিয়ে সিদ্ধ করে আমাদের দেয়া হত। ভাতের সাথে আর থাকত সামুদ্রিক শুটকির ঝোল। একদিন দুপুরের খাবারের বিরতিতে প্রশিক্ষণ মাঠ থেকে ফিরে প্লেট-গ্লাস নিয়ে খেতে বসেছি। এদিনও বরাবরের মত খেসারির ডাল আর সামুদ্রিক শুটকি মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছি। সামুদ্রিক শুটকি মাছের পিছ তরকারির ঝোলে ডুবানো থাকতো বিধায়, এটি কতটুকু পরিষ্কারভাবে ধুয়া হয়েছে বা এর ভেতরে অন্যকিছু আছে কিনা বোঝার উপায় থাকতো না। এদিন তীব্র রোদ ছিল, খাঁ খাঁ রোদে মাঠ থেকে ফিরে ক্ষুদা ছিল তুঙ্গে। সারি সারি বসে আমরা গোগ্রাসে খেয়ে যাচ্ছি। প্রথম প্রথম বেশ কষ্ট হলেও কয়েক সপ্তাহের ট্রেনিংয়ে এখন কিছুটা ধাতস্থ হয়েছি। এছাড়া এই কয়দিনে খাবারের প্লেট-গ্লাসের শুচিবাইও ছাড়তে শুরু করে। জীবনের মায়াকে যেখানে তুচ্ছ করে যুদ্ধে নেমেছি, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চিন্তা অবান্তর। কিন্তু, অদৃষ্ট নিয়তি আমাকে পিছু ছাড়েনি। সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় প্লেটে বেশ বড় একটা শুটকি মাছের টুকরা আসে। গাছের ছায়ায় ঘাসের উপর অন্যান্যদের সাথে খেতে বসে পড়লাম। সুন্দর করে মেখে বড় বড় লোকমা মুখে পুরে আয়েস করে খাচ্ছি আর গল্প করছি। খাওয়ার প্রায় শেষের দিকে দেখি শুটকি মাছের ভেতরে প্রায় আঙুলের মত মোটা কিরা (পোকা); অন্যমনস্কভাবে এর অর্ধেক খাওয়া হয়ে গেছে।আর যাই কোথায়, মুহূর্তে শুরু হল বমি আর বমি। মনে হচ্ছিল পেটের নাড়িভুঁড়ি উগরে দিই। গ্রামের কাঁচা পায়খানার কিলবিল করা পোকার কথা মনে পড়ে গেল। প্লেটের বাকি মাছের দিকে আর তাকাতেই পারছিলাম না। যখনই পোকাটার দৃশ্য মনে হচ্ছিল, তখনই জীবনপ্রাণ দিয়ে বমির চেষ্টা করছিলাম। আশেপাশের সবাই হইরই ছুটে এলো, এমন গগনবিদারী আওয়াজে বমির কারণ তাঁরা খুঁজতে লাগলো। যখন শুনলো, ঘটনা এই, তখন তাঁরা হাসতে হাসতে শেষ। কারণ, সামুদ্রিক শুটকি মাছের পোকা প্রতিদিনই কারো কারো পাতে পড়ছিল। আমি জানতাম না। ফলে, বিষয়টি তাঁদের কাছে স্বাভাবিক হলেও আমার কাছে ছিল বিবমিষার চূড়ান্ত। যাইহোক, যুদ্ধের আগে কুলসুমের মায়ের ‘ফু’ দেয়া দুধ খাবো না বলে জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত দুধ ফেলে দেয়ার সেদিনের শাস্তি আমাকে পেতে হয়েছে। যুদ্ধ কেবল শত্রুর সাথে নয়, নিজের সাথেও হয়েছে। যে খাবার কোনদিন মুখে তোলার যোগ্য নয়, সে খাবার খেতে হয়েছে, যেখানে ঘুমানোর কল্পনাও করিনি কোনদিন, সেখানে ঘুমাতে হয়েছে। দেশ মায়ের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে আমার সকল আমিত্ব ঘুচেছে। অনেকের কাছে যুদ্ধ নিছক ইতিহাসের বর্ণনা, অথচ এর যোদ্ধাদের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাস কেউ ঘেঁটেও দেখে না। যুদ্ধে, কত মায়ের আদরের দুলাল এমন শত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই!

    বাংলাদেশ সময়: ৫:২৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১

    dainikbanglarnabokantha.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ