শুক্রবার ৬ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

>>

পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের পরিচালক শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক:   |   বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট

পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের পরিচালক শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের পাহাড়

দেশে দুর্নীতির প্রসঙ্গ এলে যে-সব প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিম্নপদ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পদধারীর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগের আমলে এই প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি না করাই যেন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তেমনি একটি বড় চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহ।
তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাবর রোডে বি-ব্লকের ১৩/এ/১ নম্বর শেলটেক চন্দ্রমল্লিকায় তার রয়েছে আলিশান ডুপ্লেক্স এপার্টমেন্ট। এছাড়াও শ্যামলীর ২ নম্বর রোডে ১২-ঠ-৭ হোল্ডিংস্থ একটি মার্বেল পাথর খচিত বিলাসবহুল বাড়িও রয়েছে। গাজীপুরের জয়দেবপুর ও চন্দনায় রয়েছে দু’টি নজরকাড়া বাড়ি।
শুধু তাই নয়, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরার কাচারিকান্দিতেও নামে বেনামে বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতিবাজ এ কর্মকর্তা মাঝে মধ্যেই দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যেরে দেশগুলোতে পরিবারের সদস্যদের বিলাস ভ্রমণের খবর সবারই জানা। সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অধীনস্থ বিআরটিএ’র বিগত সময়ের সিএনজি ‘রিপ্লেস’ ধান্ধার হোতা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঘুষবাজ রক্ষণাবেক্ষণ আরেক লম্বা হস্তের খুশি-খেয়াল মতো ধান্ধায় বেহুশ। তিনি সেই লম্বা হাত মানে-পরিচালক প্রশাসন’র নির্দেশে যে কয়জন ওই আন্দোলন ভিন্নখাতে নেয়ার ধ্বংসযজ্ঞের ইন্ধন যুগিয়েছেন-তাদের মধ্যে অন্যতম।
সূত্রটি জানায়, বরাবরই তিনি তার অদৃশ্য লম্বা হাতের ছোঁয়ায় অর্থাৎ পরিচালক প্রশাসনের ক্ষমতা বলে রক্ষাকবজরূপে সব সার্কেলের ঘুষবাজদের সক্রিয় রাখার বিনিময়ে পান মোটা উৎকোচ। এর আগেই ডিডি থাকা অবস্থায় সিএনজি’র রিপ্লেস ধান্ধাসহ মোটা দাগে লুটপাটের টাকায় বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিকানার সাথে মহাগুরু বনে যান। এরপর ওই তকমায় চিটাগাং থেকে ঢাকায় ফিরে রয়েছেন বহাল তবিয়তে। আর নিয়োগ বদলি বাণিজ্যে তো বরাবরই তার জুড়ি মেলা ভার।
এছাড়া তিনি বিআরটিএ’র ‘জমিদার’ বলে বেশ পরিচিত। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে-শতাধিক গাড়ির শোরুম ম্যানেজারও। আর এসব সখ্যতা ও সুখ্যাতির অক্ষুণ্ণতা রক্ষায়ই আলোচিত ছাত্র আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার অংশীদার হয়ে বিআরটিএ’র ধ্বংসযজ্ঞের একটি অংশে মূল কয়েক হোতাদের পরেই পরিচালক শহীদুল্লাহ’র নাম ছড়াচ্ছে। যা চলমান সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার সরাসরি বরাত না মিললেও সংশ্লিষ্ট দফতরেও নানা মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। সদ্য বিআরটিএ’র ওই লম্বা হস্তের সাথে এ শুভানুধ্যায়ীর বে-খবরটিও ঘুরপাকের আভাসে এ থেকে নিজেকে আড়াল করার নানা ফন্দিও তিনি ইতোমধ্যে এঁটে রেখেছেন। তার মানে-ওই সেই কথা”ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না” অর্থাৎ-তিনি ওই আন্দোলনের সময় দেশে ছিলেন না, বলে প্রচার শুরু করেছেন।
স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে চেয়ার ধরে রেখেছেন এসব আমলারা। পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে অর্থ যোগানদাতাদের তালিকায় প্রথম দিকেই আছে এই শহীদুল্লাহর নাম।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, সংস্থাটি থেকে ঘুষ ও চাঁদা তুলে ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রাখতেন শহীদুল্লাহ। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রামে ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনে প্রতি ইউনিটে ২ লাখ টাকা ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আর তাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলেন উত্তরা মোটরসের সাতজন ডিলার। এই হিসাবে, শুধু এ প্রকল্প থেকেই ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায় হয়।
এ ছাড়া, ভারতে তৈরি চার আসনের ২ হাজার ম্যাগজিমা অটোরিকশাকে বেআইনিভাবে ৭ আসনের অটো-টেম্পু হিসেবে রেজিস্ট্রেশন দিয়ে গাড়ি প্রতি ২ লাখ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামের ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি অটোরিকশা থেকে গাড়িপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।
সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে শহীদুল্লাহ ও তার সিন্ডিকেট ৩৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই সময় তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন চট্ট মেট্রো-১ এর এডি তৌহিদ হোসেন। বর্তমানে তিনি পদোন্নতি পেয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। তৌহিদ হোসেন সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী ও বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের এলাকা নোয়াখালীর পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএকে উৎকোচ বাণিজ্যের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিলেন।
একপর্যায়ে সমালোচনার শুরু হলে শহীদুল্লাহকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক করে ২০২২ সালে ঢাকায় নিয়ে আসেন ওবায়দুল কাদের, সচিব আমিন উল্লাহ নুরী ও চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। এখানে এসেও দুর্নীতির ধারা অব্যাহত থাকে।
ঢাকায় দায়িত্ব পালনের শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পান ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জি. মোশারফ হোসেনের কথিত ভাতিজা ও ফরিদপুর-৪ এর সাবেক সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে। যাকে সম্প্রতি বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
বিআরটিএতে দালাল সিন্ডিকেট শক্তিশালী করার মূল কারিগরই ছিলেন এই শহীদুল্লাহ ও রফিকুল। এই দুই কর্মকর্তার কারণে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে দালাল ছাড়া কোনো কাজই হতো না। কারণ দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করলেই মিলত মোটা দাগের উৎকোচ।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে প্রায় ১৮ হাজার পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয় এসব সার্কেলে। ফলে মাসে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং তিন বছরে মোট ১২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে-যার একটি অংশ সরাসরি যেত সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে।
শুধু তাই নয়, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পিএস ও বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম চন্দ্র পালের সঙ্গে শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতারও অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলন নস্যাতের ষড়যন্ত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও শহীদুল্লাহর নামে-বেনামে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি। মোহাম্মদপুর বাবর রোডে একটি ডুপ্লেক্স, শ্যামলীতে মার্বেল খচিত বহুতল ভবন এবং গাজীপুরে দুটি বাড়ির কথা অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে চেয়ার ধরে রেখেছেন এসব আমলারা। পলাতক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী ফান্ডে অর্থ যোগানদাতাদের তালিকায় প্রথম দিকেই আছে এই শহীদুল্লাহর নাম।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, সংস্থাটি থেকে ঘুষ ও চাঁদা তুলে ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত নির্বাচনী তহবিল গঠনে বড় ভূমিকা রাখতেন শহীদুল্লাহ। এই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন উপ-পরিচালক ছানাউল হক, মোরছালিন ও রফিকুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, নানা অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ জুন এক অফিস আদেশে বিআরটিএ’র ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক প্রকৌশলী মো. শহীদুল্লাহ কে বিআরটিএ সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার উইং পরিচালক হিসেবে বদলী করা হয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় ‘বিআরটিএ’ ঘিরে অদৃশ্য শক্তির বলয় তৈরি করে রেখেছেন।
এ খাতের অনিয়ম দেখার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির যে বিভাগটি রয়েছে, সেটিও তার হাতের মুঠোয়। বিআরটিএ’র সব কূটকৌশলের মাস্টারমাইন্ড বলেও রয়েছে তার খ্যাতি। শহীদুল্লাহ’র সর্বোচ্চ পদে আসীনদের সঙ্গেও তার অন্তরঙ্গ ওঠা বসা। এভাবেই নীতির ফেরিওয়ালার বেশে বিগত কয়েক বছরে চতুর শহীদুল্লাহ নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ’র সদর দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Facebook Comments Box

Posted ৯:১০ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬

dainikbanglarnabokantha.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আজ বিজয়া দশমী
(1411 বার পঠিত)

এ বিভাগের আরও খবর

সম্পাদক

রুমাজ্জল হোসেন রুবেল

বাণিজ্যিক কার্যালয় :

১৪, পুরানা পল্টন, দারুস সালাম আর্কেড, ১১ম তলা, রুম নং-১১-এ, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০১৭১২৮৪৫১৭৬, ০১৬১২-৮৪৫১৮৬, ০২ ৪১০৫০৫৯৮

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

design and development by : webnewsdesign.com

nilüfer escort coin master free spins