রাজগিরে দুইদিন থাকার পর ট্রেনেই দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হই। যে ট্রেনের যাত্রী হয়েছিলাম তার নাম” শ্রমজীবী এক্সপ্রেস। ট্রেনে উঠার পর ঠাসা ঠাসা,গাদাগাদি ও অসম্ভব রকম ঘেঁষাঘেঁষি অবস্থা দেখে বিরক্ত ও বিশ্মায়িত হয়ে পড়ি। সহযাত্রীদের আধো আধো হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করি,’ ট্রেনকা এ্যয়া হালাত ক্যায়া হ্যায়? তারা হিন্দিতে উত্তরে যা বলে তাতে বুঝতে পারি ” এটি শ্রমজীবী এক্সপ্রেস ,শ্রমজীবী এক্সপ্রেস চালুই হয়েছে বিহারের শ্রমজীবী মানুষ অর্থাৎ শ্রমিক ও দিনমজুরদের জন্য,। অবস্থা দৃষ্টে তাই দেখা গেল। ট্রেনের যাত্রী সবাই শ্রমজীবী তা নয়। সাধারণ যাত্রীরা ও আছেন। একদিন ও এক রাতের দূরত্বের পথ পাড়ি দিতে দিতে বিহার এবং বিহারের শ্রমজীবী নানা শ্রেণি পেশার মানুষের বৈচিত্রময় জীবন জীবিকা নিয়ে কথা হয়েছে অনেকের সাথে। যাত্রীরা সবাই হিন্দি ভাষাভাষী। আমার প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা বলার সুযোগ নেই মোটেও। তবে তারা আমাকে”বাঙাল, বলে সম্বোধন করেছেন। আমি হঠাৎ করে বাংলা ও ইংরেজি মিশ্রিত হিন্দি বলতে চেষ্টা করে মনের অজান্তেই ভিতরে ভিতরে কিছুটা হেসেছি।
একটু উল্লেখ করে নিচ্ছি যে, বাংলাদেশের মানুষ কমবেশি সবাই নবাবী আমল, নবাবদের বিশেষ করে নবাব সিরাজদৌলার কথা কমবেশি জানেন। সিরাজদৌলাকে বলা হয় বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব। সেই মুঘল আমলে মুঘলদের কাজের সুবিধার্থে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে একটি প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল-যাকে ‘সুবাহ বাংলা , বলা হতো। তখন ওই সুবাহের শাসন ভার দেওয়া হয়েছিল নবাবদের উপর । নবাব সিরাজদৌলা বাংলা, বিহার উড়িষ্যা শাসন করতেন বলেই তাঁকে বলা হয় ,’ বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব,। সুবেহ বাংলার প্রথম নবাব ছিলেন মুর্শীদ কুলী খান। মুর্শিদাবাদ ছিল সুবাহ বাংলার প্রধান কেন্দ্রস্থল যেখানে বসে পুরো সুবাহ শাসন করা হতো। এখন সুবাহ নেই,সিরাজ নেই নবাবী ও নেই। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা থাকলে ও বিভক্ত হতে হতে আমরা আছি অবিভক্ত বাংলার অর্ধাংশ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশে। আমাদের এ বাংলাদেশে বিভিন্ন চা বাগানে সেই সুবাহের বিহার ও উড়িষ্যার চা শ্রমিকরা এখনো কাজ করে । আমরা যে চা পান করে স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করি, হৃদয়তন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়ে রক্ত সঞ্চালন করি, ক্লান্তি দূর করে রোমাঞ্চের গল্প করি এবং মেহমানদের এক কাপ চা অফার করে যে আত্মোতৃপ্তি পাই, ঋণে আবদ্ধ করে ভদ্রতা দেখাই সে চা আসে নিরীহ চা শ্রমিকদের হাতের ছোঁয়ায় ও বেদনার অশ্রুধারায় পানীয় হয়ে । এক কাপ চায়ে রয়েছে ওই বিহারি শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম।
– যতটুকু জানা যায়, অনেক আগে থেকেই বিহার রাজ্যে গরীব অসহায় মানুষ বেশি ছিল যাদের অধিক সংখক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তখন ছিল প্রভু- দাসের সময়। দাসদের উপর যখন তখন নেমে আসতো প্রভুদের নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা, অনৈতিক প্রাধান্য ও যত সব বিবেকহীন আচরণ। সেই আদিকাল থেকে মানুষে মানুষে সহমর্মিতা, সহানুভূতি,,সমমর্যাদার অভাব ,সভ্যতার ব্যর্থতা এবং জাতিভেদ প্রথার কর্ম ও জন্মের বলি হয়ে তারা আজোও অধঃপতিতই রয়ে গেছে। ওই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষদের ছিলনা কোন শিক্ষা গ্ৰহণের অধিকার। যদিও ভারতবর্ষের প্রথম শিক্ষার সূত্রপাত হয়েছিল বিহারে। বিহারেই গড়ে উঠেছিল পৃথিবী বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু নালন্দান সহ সব শিক্ষায়তন তাদের বঞ্চনা করছে । তাদের বেশির ভাগ মানুষ চা শ্রমিকের পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অসহায়ত্বের শিকার শ্রমিকদের উপর চলতো নির্যাতনের ষ্টিমরোলার। উপনিবেশিক শোষণের তারা ছিল প্রধান হাতিয়ার। ব্রিটিশ যুগে তাদের উপন নেমে এসেছিল অমানুষিক নির্যাতন। ব্রিটিশরা অসহায় শ্রমিদের সাথে কথা বলতো লামি মেরে মেরে। শ্রমিকদের নাম দিয়েছিল কুলি। কুলিরা চলতো যন্ত্রের মতো। দৈনিক মজুরী ছিল খুবই কম। কষ্টের প্রাত্যহিক যন্ত্রনা ভুলে থাকার জন্য জোর করে তাদের নেশা করানো হতো। বিহার রাজ্যই ছিল কুলি শ্রম পাওয়ার প্রধান উৎস। তখকার বিহার থেকে উন্নত জীবন ও বেশি মজুরী পাওয়ার লোভ ও প্রতিশ্রুতিতে লক্ষ লক্ষ কুলি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার চা বাগানে পাড়ি জমিয়েছিল। তারা যেখানেই গেছে সেখানেই থেকে গেছে। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বৈষম্যহীনভাবে এখনো আছে। ১৮৪৭ হতে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের সিলেটের মালনিছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠাকালে ভারত বর্ষের নানা জায়গা থেকে চা শ্রমিক আনা হয়েছিল -যাদের বেশির ভাগই ছিল বিহারের। তাদের আনার পিছনেও ছিল নানা প্রকার মিথ্যাচার, শক্তি প্রয়োগ, কপটতা ও প্রলোভন।
বাংলাদেশে চায়ের পরীক্ষা মূলক আবাদ শুরু হয়েছিল ১৮৪০ সালে চট্রগ্ৰামে। চট্রগ্ৰাম ক্লাব ও তার আশপাশের জায়গায় শুরু করা হয়েছিল। তার আগে আসামে চা চাষ আরম্ভ হয়। তার ও অনেক আগে চীন দেশে সর্ব প্রথম চা উৎপাদন হতো। চা পানে জনগণকে বাধ্য করার জন্য চীনের তৎকালীন রাজা কঠোর ফরমান জারি করেছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৬৭টি চা বাগান আছে। সবচেয়ে বেশি ৯১ টি বাগান মৌলভীবাজারেই । ১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে পাকভারত উপমাদেশের জন্য প্রসিদ্ধ সিলেটের মালনিছড়া চা বাগানের রয়েছে স্বতন্ত্র পটভূমি এবং ইতিহাস। আমাদের উত্তরবঙ্গে প্রায় শতাধিক ছোট ছোট চা বাগান। চা বাগানগোলোতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক উৎপাদন, উত্তোলন ও বিপনণ কাজের সাথে জড়িত। তাদের ৮০% ভাগই অবাঙালি এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি অনেকটাই ভিন্ন।
বর্তমান সময়ে চা ব্যতিত বাঙালিদের এক মুহূর্ত ও চলেনা। অথচ একটি সময় বাংলাদেশে চা পানের প্রচলনই ছিলনা। বিগত শতাব্দীর চল্লিশ, পঞ্চাশ এমন কি ষাটের দশকেও চা পান তেমন ব্যাপকতা লাভ করেনি। বাগানের উৎপাদিত চা পচে,গলে ও শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যেতো। চায়ের প্রস্তুত প্রণালী অনেকেই জানতেন না। ওই অবস্থায় সাধারণ মানুষকে
চা পানে আগ্ৰহী করার জন্য নানাভাবে, নানা কৌশলে প্রচার প্রচারনা
চালানো হতো। বেশির ভাগ প্রচার প্রচারণা করা হয়েছে গ্ৰাম্য হাঁটবাজারে। বাজারে ঢোল পিটিয়ে,গান গেয়ে মানুষ জড়ো করে জোকার টাইপের লোকেরা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে চা পানের কৌশলাদী শিখিয়ে দিতো। পদ্ধতি দেখিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে চা তৈরি করে উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের চা পান করানো হতো। অনেক সময় বিনা পয়সায় চা পাতিসহ এমন কি চিনি ও ফ্রি দেওয়া হতো। তাদের সে সময়ের পরিশ্রম যে ব্যর্থ হয়নি আজকাল চা গ্ৰহণের ব্যাপকতাই তার প্রমাণ।
চা শ্রমিকরা বিভিন্ন ভাবে বঞ্চনার শিকার হলেও তাদের জীবনযাপন অনেকটা বৈচিত্রময়। এতটাই বৈচিত্র পূর্ণ যে তাদের নিয়ে কাব্য রসিকদের কলম গতি পায় । তাদের বিশেষ করে পিঠে ঝুড়ি বেঁধে বাগানে কুড়ি তোলা মহিলা শ্রমিকদের পোষাক পরিচ্ছদ দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়, অনেকের মনে অজানা রোমাঞ্চ আনে। আবার ধারণা করা হয়,চা শ্রমিকদের মনোমুগ্ধকর বেশভূষা আর কর্মকান্ডের কারণেই চা শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। শ্রমিকদের নিয়ে রচিত হয়েছে বুড়িবুড়ি কবিতা, গল্প, সিনেমা, নাটক উপন্যাস। শ্রমিকদের কষ্ট ও কঠোর শ্রমের বিনিময়ে চা শিল্পের প্রসার ঘটেছে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী। শ্রমিকদের কেউ আবার সুন্দর গানের সাথে জুমুর নাচ করে। কিন্তু ওই সমস্ত গান এবং নাচের আড়ালে তাদের জীবনে বেদনার যে অশ্রুধারা লুকিয়ে আছে তা কেউ দেখতে পায়না। যদিও তারা কিছু কিছু বকশিস পায়- কিন্তু তাদের অন্তর নিরবে কেঁদে কেঁদে জীবন হিসেবের পাওনা চায়।
-সভ্যতার বিবর্তন ও উন্নয়নের ফলে বিহার কিংবা উড়িষ্যার মতো দেশ ও এলাকাগোলো এখন অনেক এগিয়ে গেছে, উন্নতি সাধন করেছে। সেখানকার মানুষ সবদিক দিয়েই উন্নত জীবনযাপন করজেন। কিন্তু একদিন বেঁচে থাকা,খাওয়া পরার দারুন অভাবে মাথা গুঁজার ঠাই না পেয়ে যারা চলে গিয়েছে পৃথিবীর বিভিন প্রান্তে, আজ সে সব এলাকার মাটির টান অনুভব করলেও ফিরে যাওয়ার মতো কোন দরজাই তাদের জন্য উন্মুক্ত নয়। এ পৃথিবী কোথাও কোথায় বড়ই অসহায়।। অতীতের নিষ্ঠুর শ্রম বিভাজন ও অবহেলা কিছু কিছু মানুষকে এতটা পিছনে ফেলে দিয়েছে যে, সেখান থেকে উঠে আসার পথ বুঝি রুদ্ধ।
-যে চা পানে আমরা পাই বর্ণিল সুখানুভুতি, লেখা হয় জীবনের গল্প, সে চায়ের যোগানদাতা শ্রমিকরা হোক আমাদের কাছের ও প্রাণের বন্ধু। মানবেতর জীবনের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে তারা ও পাবে আধুনিকতার ছোয়া, জীবনের দর্শন এবং উন্নত জীবন এমন প্রত্যাশা হোক সকলের। শ্রম দিয়ে নয় মানুষের মূল্যায়ন হোক তার কর্ম পরিচয়ের মাধ্যমে। চা শ্রমিকরা কোনভাবেই অস্পৃস্য নয়- তারা শ্রমিক যেমন আছে কারখানা শ্রমিক কিংবা কৃষি শ্রমিক। লেখাটি শেষ করবো,” এক কাপ চা, সিনেমার কথা দিয়ে। পৃথিবীতে চা শ্রম ও শ্রমিক নিয়ে বহুবিধ নাটক সিনেমা রয়েছে । বাংলাদেশে ২০১৪ সালে নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল পরিচালিত, এক কাপ চা,সিনেমা নির্মিত হয়েছে। অভিনয় করেছেন মৌসুমী, সাকিব খান, ঋতুপর্ণা সেন ও ফেরদৌস। প্রয়াত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী তার জীবনের শেষ অভিনয় করেছেন এ” এক কাপ চা, ছবিতে। নায়ক তার ভালোবাসার মানুষটিকে কোনভাবেই তাকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিতে না পেরে বার বার চায়ের টেবিলে ডেকে বসতে চেষ্টা করতেন। সিনেমাটি জীবন মরণের ঘটনা নিয়ে আবর্তিত হতে হতে যবনিকাপাত হয় এক কাপ চায়ের মাধ্যমে দুটি জীবন এক হয়ে। শেষ হয় একটি গান দিয়ে। গীতিকার কবির বকুলের সে গানে উঠে এসেছে জীবনঘন চায়ের মর্মকথা যে কথায় আছে -” তোমার সঙ্গে এক কাপ চা,/তোমার সঙ্গে এক পথে পা।/ তোমার সঙ্গে এক মনে মন,/ তোমার সঙ্গে একটা জীবন।
লেখকঃ কলামিস্ট ও সাবেক শিক্ষা অফিসার