• শিরোনাম

    একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ ও প্রজন্ম পরিক্রমা

    শাহ আজম কোরেশী:: | রবিবার, ০৬ জুন ২০২১ | পড়া হয়েছে 522 বার

    বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব কোণে পাহাড় পর্বত ও সুবিশাল জলরাশীর সংমিশ্রণে প্রাকৃতিক জীব বৈচিত্রের নান্দনিক উপস্থাপনা বৃহত্তর সিলেট অব্জল। সপ্তম শতকের মধ্যভাগে এক রাজকীয় অনুদানের ভাষ্য মতে ‘খোলামেলা বেড়ে ওঠা বন্য প্রাণী ও বিষাক্ত সরীসৃপে ঢাকা মানব বসতির মলিনতা মুক্ত পরিবেশ, যেখানে প্রকৃতি আর কৃত্রিমতা পার্থক্য নেই।’

    প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র সভ্যতার অংশ এই অঞ্চল কামরূপ ও কিরাত রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুদীর্ঘ সময় স্বাধীনভাবে স্থানীয়রা এ অঞ্চলটি শাসন করে। আদিবাসীদের মধ্যে অষ্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয়, মধ্যইউরোপীয় যাযাবর ও বেদ জনগোষ্ঠীর আবাস ছিল। ৫ম ও ৬ষ্ঠ শতকে আর্য, ১৩ ও ১৪ শতকে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলিমদের আগমন ঘটে। ১৫ শতক পর্যন্ত উচ্চ শ্রেণীর হিন্দু, ১৬ শতকে ব্যাপক হারে মোগল ও পাঠানদের আগমন ঘটে। ওই সকল জাতির সংমিশ্রণই হল আজকের সিলেট অঞ্চলের জনগণ।

    ৬৪১ সালে হিউয়েন সঙ, ১১ শতকে আল বেরুনী, ১৩৪৬ সালে ইবনে বতুতা, ১৭৭৬ সালে রবার্ট লিন্ডসের বর্ণনায় সিলেট অঞ্চল বিশাল জলরাশি পূর্ণ সমুদ্র তীরবর্তী হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। বাংলার ব-দ্বীপ অঞ্চল পলিল বাহিত হয়ে ক্রমবর্ধমান হারে ভরাটের ফলে বিরাট হ্রদের সৃষ্ট হয়। সুবিশাল গভীর জলরাশিকে হাওর বলে। হাওর শব্দটি সাগর হতে সৃষ্ট। কালের পরিক্রমায় ওই অঞ্চলে হাওর ভিত্তিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।

    প্রাচীনকালে বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর সংলগ্ন হাওর বেষ্টিত অঞ্চলে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর আবাস ছিল। সুলতান আলাউদ্দীন খলজির সময় ১৩০৩ সালে হজরত শাহ জালাল (র.)’র নেতৃত্বে সিলেট বিজয়ের পর হতে মুসলমানদের আধিক্য বাড়তে থাকে। তখন সিলেট অঞ্চল কতক রাজ্য ও অঙ্গ রাজ্যে বিভক্ত ছিল। গৌড় রাজ্য দিল্লী সুলতানের অধিকারে আসার পর সিলেট ফৌজদার গঠিত হয়।

    ১৩০৪ সালে সিপাহশালার সৈয়দ নাছির উদ্দীনের নেতৃত্বে তরফ অভিযানে বিজিত হয়ে গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। শুরুর দিকে সিলেট দিল্লীর সুলতানাতের অধীনস্থ হলেও দিল্লীর ক্ষমতার পালাবদল ও অস্থির রাজনৈতিক দ্ব›েদ্বর কারণে প্রায় দু’শ বছর সিলেটে স্বাধীনভাবে ইসলামী শাসনে চলে। এর মধ্যে ১৫১১ সাল হতে ১৬১২ সাল পর্যন্ত আফগান সর্দারদের কর্তৃত্ব ছিল। তখন সিলেট শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকা ফৌজদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হয়ে বিশাল রাজ্যে পরিণত হয়। তরফ ও গৌড় মুসলমানদের কর্তৃত্বে থাকলেও ভাটির বিস্তৃর্ণ অঞ্চল বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী ও হিন্দু নরপতি দ্বারা শাসিত হত। বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা লাউড় রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৫ শতকে লাউড় এক ব্রাহ্মণ্য রাজা শাসন করে। বিভিন্ন স্থানে ব্রাহ্মণ্য মন্দির নির্মাণ করে ব্রাহ্মণ্যদের বসতি স্থাপনে পৃষ্ঠপোষকতা করে। একাকাম লক্ষীর ব্রাহ্মণ্য বসতি ও মন্দির সেই সময় কালের হয়ে থাকতে পারে।
    ১৬ শতকের পূর্বে লাউড় রাজ্যে মুসলমানদের কোন যুদ্ধাভিযানের তথ্য পাওয়া না গেলেও সুফি দরবেশদের আগমনের তথ্য পাওয়া যায়। রতœা নদীর অববাহিকায় ৮ দরবেশের আগমন ঘটে। ঐতিহাসিকগন তাদেরকে হযরত শাহজালাল (র.) এর সঙ্গী হিসাবে উল্লেখ করেন। জনশ্রুতি মতে হযরত সৈয়দ শাহ শামসুদ্দিন (র.) তৎকালীন কৃষ্ণপুরে মালতি নামের এক নারী কে বিয়ে করে বসতি করেন। ১৬০০ শতক পর্যন্ত গৌড় আফগান শাসকদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জগন্নাথপুর তথা লাউড় হিন্দুদের শাসন ছিল। তাই বলা যায় গৌড় ও তরফের মুসলমানদের চেয়ে লাউড়ের মুসলমানদের জীবন জীবিকা দূর্দশাগ্রস্থ ছিল। মোগলরা দিল্লীর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আফগান সর্দারগণ বিতারিত হয়ে বাংলা তথা সিলেটের নির্জন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে বসতি স্থাপন করে। ওই সময়কালে লাউড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছোট ছোট মুসলিম গুচ্ছ গ্রামের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সর্দারদের নামে ওই সকল গ্রামের পরিচিতি পায়।

    ১৬১২ সালে সিলেট ফৌজ মোগল শাসনে আসে। ইতিমধ্যে জগন্নাথপুর রাজ্যের পতন ঘটে। বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খা দিল্লী স¤্রাটের নির্দেশে মুসলমান হয়ে হাবিব খা নাম ধারণ করে জগন্নাথপুর পর্যন্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তখন সিলেট সরকার ৮টি রাজস্ব মহালে বিভক্ত ছিল। তবে রাজস্ব আদায় আশাব্যঞ্জক ছিল না। অধিকাংশ স্থান আফগান সর্দারদের নিয়ন্ত্রণে এজমালি হিসেবে গন্য ছিল। ১৫৮২ সালে সিলেটের রাজস্ব ১৬৭,০৪০ টাকা নির্ধারণ করা ছিল। সিলেট খাজা ওসমানের পতনের পর ঢাকায় অবস্থিত সুবেদারের অধিকারে আসে। পরে পর্যায়ক্রমে সিলেট অঞ্চল আফগান কর্তৃত্ব মুক্ত হয়। পরাজিত আফগানরা বিক্ষিপ্তভাবে বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন দূর্গম এলাকায় আশ্রয় নেন।

    সিলেট সীমান্তবর্তী হওয়ায় বাংলার সুবেদারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ফৌজদারের দায়িত্বে আত্মীয় বা সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হত। সেই সুবাদে হযরত শাহজালাল (র.)’র সঙ্গীদের উত্তরসুরিরা মূল্যায়িত হন। স¤্রাট আলাউদ্দিন খিলজির ফৌজের আকেঞ্জী পদমর্যাদার কর্মকর্তা হযরত শাহজালাল (র.)এর সিলেট বিজয়ের সঙ্গী শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর বংশধরেরা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনে তারা বৃহত্তর সিলেটে ছড়িয়ে পরেন। তাদের মধ্যে শেখ জামাল উদ্দিন ফারুকী (সুনামগঞ্জ), দেওয়ান শেখ ফাতেহ মোহাম্মদ (সিলেট শেখঘাট), ফৌজদার একরাম উল্লাহ (সিলেট), শেখ ফয়জুল্লাহ (ঢাকা দক্ষিণ), শায়েখ মোহাম্মদ ওরফে করমাখঞ্জী (সৈয়দপুর) উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া কাছার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর বংশধরগন বসবাস করছেন। শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর পিতা আরবের মক্কা নিবাসী কোরাইশ গোত্রের শায়েখ বাহাউদ্দীন ফারুকী। শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর মাজার সিলেট শহরের শেখ ঘাটে অবস্থিত। তার উত্তর পুরুষ শায়েখ মোহাম্মদ ওরফে করমাখঞ্জী প্রথম সৈয়দপুর আসেন। সৈয়দপুরে তাকে ও তার বংশধরদের করম আকেঞ্জীর (করমাখঞ্জীর) বংশের বলা হয়।

    সুবেদার শায়েস্তা খানের পর মুর্শিদকুলী খান বাংলার সুবেদার হিসেবে ভূমি ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করেন। তার সময়ে বাংলাদেশ ১৩টি ছাটলা ও ১৬৬০টি পরগনায় ভাগ হয়। মুর্শিদকুলী খানের আমলে বাংলার ভূমি ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল জায়গির বাতিল করে জমিদারী সৃষ্টি করা। তবে উরিষ্যাসহ পার্বত্য ও দুর্গম অঞ্চলে নতুন জায়গির সৃষ্টি করে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়ানো হয়। ওই সময়কালে বাংলার জায়গির বঞ্চিতরা নতুন নতুন জায়গির প্রাপ্ত হয়ে সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে মৌজার সৃষ্টি সময় ওই সকল জায়গিরদার নাম মৌজায় যুক্ত হয়।

    সিলেটের ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার শুরু হয় মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর ১৭২৮ সালে। তখন সিলেটের ফৌজদার ছিলেন শমশের খান, যার আসল নাম হামিদ কোরেশী। তার সময়ে সিলেটে ৩৬টি পরগনায় ছিল। তিনি ৪ জন নায়েব ফৌজদার দ্বারা শাসন করেন। তখন ফৌজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর উত্তর পুরুষ শায়েখ মোহাম্মদ ও তার পরিবার। ফৌজের দায়িত্বপালনের পাশাপাশি মুসলমানদের শিক্ষা প্রসারের জন্য শায়েখ মোহাম্মদ ওরফে করমাখঞ্জীকে ফৌজদার হতে আতোয়াজান পরগনায় সাড়ে সাত হাল কর মুক্ত চেরাগি ভূমি ও একটি বাড়ী দান করা হয়। বাড়িটি নবগঠিত সৈয়দপুর মৌজার কে›্দ্র স্থলে ছিল। শিক্ষার প্রসার ঘটায় সৈয়দপুরের মর্যাদা বাড়তে থাকে। সৈয়দপুর মৌজায় কতক ভিন্ন সৈয়দ পরিবারের বসত ছিল বিধায় সাধারনভাবে সৈয়দপুর নামে মৌজা গঠিত হয়। যদিও আশপাশের বসতি মৌজা ব্যক্তি নামে গঠিত হয়। আবাসিক মৌজা হওয়ায় বসবাসকারীগন বক্রাদারদের নিকট কর দিতেন। স্থানীয়রা সাধারণত কৃষি নির্ভর ছিলেন। বর্গা চাষী হিসেবে বাৎসরিক হারে ভাড়ায় জমি আবাদ করতেন। তাই যাদের যতবেশী হালের যোগার ও লোকবল ছিল তারা তত স্বাচ্ছন্দ্যে জীবিকা চালাতেন। বক্রাদারদের সাথে সাধারণ কৃষকশ্রেণী সরাসরি সম্পর্কিত ছিল বিধায় বক্রাদাররা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হতেন।

    মোগল শাষকদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট ছিল ধর্মীয় উদার নীতি। মুসলিম শাসক হয়েও বিভিন্ন ধর্মীয় স¤্প্রদায়কে ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। মুসলিম প্রধান গ্রামে মাজার ও মসজিদ বা হিন্দুদের গ্রামে মন্দির নির্মানে সহায়তা করতেন। তাদের পৃষ্টপোষকতায় সত্যপীর, দরবেশিয়া, বাউলসহ কতক সাধারণ ধর্মীয় সংস্কৃতির সুচনা হয় যা হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজন অনুসরণ করত।

    বাংলার সুবেদারদের একটা বড় অংশ শিয়া মতাবলম্বী ছিলেন। তাই তারা শিয়া স¤্প্রদায়ের আচার অনুষ্টানে প্রচুর অনুদান প্রদান করতেন। এদিকে শায়েখ মোহাম্মদ ওরফে করমাখঞ্জী শরিয়তি ধারায় দীক্ষিত হয়ে নির্জন জঞ্জালে শরিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে ফৌজদার বরাবরে তার খরচ নির্বাহের আবেদন করেন। মাদ্রাসাটি আতোয়াজান পরগনার আশপাশে কোন এক নির্জন উঁচু টিলায় ছিল বলে বংশানুক্রমে ধারনা করা হয়। তার আবেদনটি ১৭৪৯ সালে নবাব নজিব আলী খা কর্তৃক গৃহিত হয়। তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা হতে অনেক মুফতি ও মৌলবীর সৃষ্টি হয়।

    ইতিমধ্যে বাংলায় অনেক ঘটনাবহুল ইতিহাসে রচিত হয়। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর ব্রিটিশ শাসনের দিকে ধাবিত হয়। প্রথমে পুতুল সরকার গঠন করে ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি কুক্ষিগত করে।
    মধ্যযুগীয় বাংলায় সংখ্যালঘু সাধারণ মুসলিম সমাজ শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতেন। পলাশির পরাজয়ের পর বৈষম্য আরও বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ রাজের শোষণ নীতি বাংলার জনজীবন দূর্বিষহ করে তুলে। খরা, বন্যা, মহামারী, দূর্ভিক্ষ বাংলার জনসংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলে। মানুষের গড় আয়ু আশঙ্কাজনক ভাবে কমে যায়। অনাবাদী জমির পরিমাণ এতই বাড়তে থাকে যে পুরো বাংলাই ঝুপ জঙ্গলে পরিনত হয়। বিশেষ করে ১৭৬৯ এর দুর্ভিক্ষকে ৬৯ মনন্তর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

    এদিকে কোম্পানি শাসনামলের অতিমূনাফালোভী বাণিজ্য ও শোষণ নীতি বাংলার জীবন যাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে পরে। জনগণ কৃষি থেকে মূখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। সনে সনে অনাবাদী জমির পরিমাণ বাড়তে থাকে। রাজস্ব বকেয়া বাড়তে থাকা ও রাজস্ব পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকায় শাসকদের টনক নড়ে। কোম্পানী শাসনের শুরুর দিকে সিলেটে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে। কিছু কিছু খন্ড যুদ্ধ ও সংগঠিত হয়। এই ক্রান্তি লগ্নে সিলেট ফৌজদার যথেষ্ট স্বাধিনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ওই সময় প্রচুর জায়গির প্রধান করা হয়। তখনও দিল্লীতে মুসলিম শাসন ছিল, তাই সিলেটের আলেম উলামারা ইংরেজদের ভালভাবে মেনে নেন নাই। ১৭৮২ সালের মহরমের হাঙ্গামাই এর প্রমান, যেখার নেতৃত্বে কর মুক্ত আলেমরা ছিলেন। যা মি. রবার্ট লবন্ডসের ভাষ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠে। যিনি সিলেটের রেসিডেন্ট ও কালেক্টর ছিলেন। ১৭৮৯ সারে তিনি সিলেট ত্যাগ করেন। মহরমের হাঙ্গামার পর শায়েখ একরাম উল্লাহ ও তার পুত্র মৌলবী আতাউল্লা ওরফে আতহার আলীসহ সিলেটের আলেম সমাজ আত্মগোপনে চলে যান। তখন শায়েখ একরাম উল্লাহ সৈয়দপুরে ভাই শায়েখ মোহাম্মদের জন্য দানকৃত বাড়ীতে গোপনে আশ্রয় নেন। যেটি মুলত আলেমদের গোপন আশ্রয়স্থলে পরিনত হয়। ভ্রাতা শায়েখ মোহাম্মদের সাথে স্থানীয়দের শিক্ষা প্রসারে তৎপর হন ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুত্র মৌলবী আতা উল্লাকে নতুন নাম আতহার আলী দিয়ে শিক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে তারা আত্মগোপনে চলে যান। ১৭৮৬ সালে অনুদান প্রাপ্ত জায়গির বাতিল হলে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। শায়েখ একরাম উল্লাহ এক দল তরুণ অনুসারী নিয়ে প্রত্যন্ত নতুন অধিকৃত অঞ্চলের (জামালগঞ্জ) দিকে চলে যান। শায়েখ মোহাম্মদ তরফের সুলতানসি নিবাসী তার এক উস্তাদের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। সেখান থেকে সৈয়দপুরে তার নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। গোপনে ভাইপো মৌলবি আতহার আলীকে সার্বিক সহযোগিতা করতেন। উল্লেখ্য যে বাংলার আলেম উলামারা ব্রিটিশ বিরোধীতার জন্য দিল্লির স্বাধীন সুলতানাত হতে পৃষ্টপোষকতায় স্বরূপ আর্থিক অনুদান পেতেন। জনশ্রæতি আছে যে সুলতান সিং নামের এক জ্বীন তাদের তাবেদার ছিল যে, অনেক ধন সম্পদ দিয়ে যেত।

    রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক কারনে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দেয়। রাজস্ব সংগ্রহ ত্বরান্বিত করতে একসালার পরিবর্তে, পঞ্চসালা অতঃপর দশ সালা বন্দোবস্ত করেও যখন আশাব্যঞ্জক ফল হল না তখন স্থায়ী বন্দোবস্ত তথা জমিদারী প্রথার অবলোপ্তির পথই একমাত্র খোলা ছিল। অবশেষে ১৭৯৩ সনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন ভুমি ব্যবস্থা শুরু হল। মুলত পুরাতন জমিদার নতুন রূপে নিজেদের পান এবং অনেক জায়গির বিলুপ্ত হওয়ায় নতুন জমিদারের সৃষ্টি হয়। ১৮০৭ সাল পর্যন্ত সিলেট ফৌজদারী বলবৎ ছিল বিধায় চেরাগি ভূমি ও সৈয়দপুরের আবাসিক মৌজা জমিদারের আওতা মুক্ত ছিল। বক্রাচাষী বক্রাদারদের নিকট কর প্রদান করতেন। তবে ১৮০৭ সালে করের আওতাভুক্ত এলাকায় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সকল চেরাগি জায়গির বাতিল করে নতুন জমিদারি সৃষ্টি করা হয়। তখন আবাসিক মৌজা ভেঙ্গে তালুককে খাজনার একক হিসেবে কৃষক পরিবারে জমির বন্দোবস্ত দেয়া হয়। তৎকালীন সময়ে সৈয়দপুরে কতক কৃষক পরিবারের বাস ছিল। মুলত যে সকল আগ্রহী কৃষক হালের জোগাড় ও জনবল প্রমান করতে পেরেছিলেন তারাই তালুক প্রাপ্ত হন। এখানে বংশ পরিচয় বিবেচ্য ছিলনা। ব্রিটিশদের কাছে খাজনাই মূখ্য ছিল। কিন্তু অনেক জায়গিরদারগণ জমিদারি বা একাধিক তালুক বন্দোবস্ত গ্রহণ করলেও যারা ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন, তারা বৃটিশদের কর দিতে অনীহা দেখান। তাই ভূমি গ্রহনে অনিহা দেখান।

    সৈয়দপুরে শেখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর বংশধরগণ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় আত্মগোপনে চললেন, যদিও জমিদারি নেয়ার মত নগদ অর্থ সম্পদ তাদের ছিল। আতোয়াজান পরগণার সৈয়দপুর মৌজা এগারটি একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে তালুক বন্দবস্ত দেয়া হয়। শফি বেগ ছাড়া বাকি দশ তালুক এর উত্তরাধিকারিরা হযরত শাহজালালের অন্যতম সঙ্গী হযরত সৈয়দ শাহ সামসুদ্দিন (র.) এর বংশধর বলে দাবি করেন। তবে সৈয়দপুরের ক’জন তরুণ আলেম ছিলেন যারা ব্রিটিশ বিরোধীতার জন্য তালুক বন্দোবস্ত নেন নাই। তাদের বড় অংশ পরবর্তীতে নতুন অধিকৃত ভূমিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অন্যত্র গমন করেন।

    এদিকে মৌলবী আতহার আলী তালুকদার মনসুরের মেয়েকে বিয়ে করেন। তিনি একজন বিজ্ঞ আলেম ও ফাকেহ ছিলেন। তিনি স্থানীয়দের শরিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে তালিম দিতেন। তিনি নিজ হাতে ওজিফা ও ফিকাহ এর বই লিখে শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন। কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত এই সকল পুস্তিকাদির চর্চা সৈয়দপুরে হয়েছিল। ১৯ শতকের শুরুর দিকে এক বিরাট অগ্নিকান্ডে দান (করমাখঞ্জী) বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হলে মৌলভী আতহার আলী তালুকদার মনসুরের বাড়ীতে চলে আসেন যেটি বর্তমান দরগা মসজিদ ও তার পশ্চিম অংশ। সেখানে খানকা করে স্থানীয়দের শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করেন।

    এদিকে তালুক প্রাপ্তরা নিজেদের ভূস্বামী হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ পেলেন। বাংলার সমাজে সাম্যবাদের নতুন সংযোজন ঘটলো। গৃহস্থ কৃষক হিসেবে নিজেদের আভিজাত্য প্রকাশ শুরু হল। নামের সাথে বিভিন্ন উপাধি সংযোজিত হতে লাগল। কিন্তু সে সুখ দীর্ঘ হলনা। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফলন কমে যাওয়ায় খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে নির্যাতনের শিকার হতেন। তখন জমি হস্থান্তর যোগ্য ছিল না। তাই ১০ বৎসরের মাথায় অর্ধেকের মত গৃহস্থ কৃষক বৈরাগী জীবন গ্রহণ করেন। তারা শায়েখ পীর ও বাউলদের সঙ্গ গ্রহণ করেন। সৈয়দপুরে প্রায় প্রতিটি তালুক যৌথ মালিকানায় ছিল। কিন্তু কিছু কালের মধ্যে অলিখিতভাবে মালিকানা বদল হতে থাকে। সারা বাংলায় একই অবস্থা বিরাজ করছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে আইন অমান্য করে বন্ধকী চুক্তি করা হয়। এই সুযোগে নতুন পুজিবাদের সৃষ্টি হতে লাগল। কিছু গৃহস্থ নিঃস্ব হলেন আবার কেউ কেউ বিশাল গৃহস্থ হিসেবে প্রকাশ পেলেন। ভূমির মালিকানা শৃঙ্খল ফিরিয়ে আনতে হস্তান্তররের বৈধতা দেয়ার জন্য ১৮২৮ সালে ভূমি শুমারী করা হয়। তখন যে যেস্থানে বসত করতেন তাদের নামে সেই ভূমি রেকর্ড করে দেয়া হয়। কিন্তু ভূমির পরিচিতি নির্দেশে তালুক নাম্বার ব্যবহার অক্ষুণ্ণ ছিল। মন্তব্য কলাম সংযোগ করে দখল মালিকানা নিশ্চিত করা হয়। এর পর থেকে দলিল করে মালিকানা বদল হতে থাকে। তখন থেকে শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর বংশধররা জমি ক্রয় করতে শুরু করেন। তার উত্তর পুরুষদের মধ্যে শায়েখ আহমেদ উল্ল্যাহ, শায়েখ মাহমেদ উল্ল্যাহ, শায়েখ আশ্রফ আলী, শায়েখ ইসমাইল আলী প্রমুখ। তৎকালীন সময়ে সৈয়দপুরে সীমিত সংখ্যক পরিবারের বসত ছিল বিধায় সবাই একান্নবর্তী পরিবারের মত থাকতেন এবং সবাই একে অন্যের আত্মীয় ছিলেন। শায়েখ আহমেদ তালুকদার ছয়েফ আলীর বংশে, শায়েখ ইসমাইল আলী তালুকদার রবি বংশে, শায়েখ আশ্রফ আলী তালুকদার মনসুরের বংশে বিয়ে করেন। সমসাময়িক অন্যান্যরা হলেন সৈয়দ আছিন আলী, সৈয়দ কাছিন আলী, সৈয়দ মহরম আলী, সৈয়দ বদি উল্লা, সৈয়দ শাহ নুর শাহ প্রমুখ। শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর পরবর্তী প্রজন্মের হলেন শায়েখ রেজান আলী শাহ ওরফে রজিউল্ল্যাহ, শায়েখ রমিজ উদ্দিন কোরাইশী ওরফে রঙ্গী শাহ, শায়েখ আজিম উল্ল্যাহ, শায়েখ নাজিম উল্ল্যাহ, শায়েখ কাজিম উল্ল্যা, মৌলবী চান্দ আলী, শায়েখ আনোয়ার আলী, শায়েখ আরিফ মোহাম্মদ, শায়েখ শরিফ মোহাম্মদ, মৌলবী ইছিম আলী, মৌলবী মোজাফফর আলী, মৌলবী রইছ আলী প্রমুখ। তাদের উত্তর পুরুষদের অধিকাংশ সৈয়দপুরে বসবাস করছেন। এছাড়া অনেকে হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও কাছাড়ে বসবাস করছেন। সমসাময়িক অন্যান্যরা হলেন সৈয়দ বরকত উল্লাহ, কছিব শাহ, শেখ লেদু, সৈয়দ ইছাব আলী, সৈয়দ রবি, সৈয়দ আর্জু মুন্সি, সৈয়দ আমীন আলী, সৈয়দ কালা, সৈয়দ অজি উল্লা, সৈয়দ মাহিন আলী, সৈয়দ ভেটু শাহ, মাহমুদ বেগ, সৈয়দ হাতিম আলী, সৈয়দ হাফিজ আলী, সৈয়দ আব্দুল্লাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

    বাংলার অর্থ-সামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ভূমিহীন কৃষক বেড়ে যায়। আবার নতুন নতুন জমিদারের সৃষ্টি ও তাদের অত্যাচারে সাধারন কৃষক কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অতৈই জলরাশীর হাওর জীবনে মরমি সাধকদের বিকাশ ঘটে। ময়মনসিংহ গীতিকা ভান্ডার সমৃদ্ধ হতে থাকে। সুফিবাদের দুটি ধারা প্রকাশ পায়। আলেম উলামাদের প্রভাবিত শরিয়তি এবং বাউল প্রভাবিত মারিফতি। হাওর বেষ্টিত পরিবেশে প্রান্তিক কৃষকদের নৈকট্য পেতে মরমি গান উভয় মতের পীরগণ চর্চা করেন। বিধি-বিধান সহজ ছিল বিধায় মারিফতে সমর্থক বেশী ছিল, তবে শিক্ষিত সচেতনদের কাছে শরিয়তির কদর ছিল বেশি। মারিফতের পীরগণ সাধারণত আরবি–ফার্সি জানতেন না। কিছু সুরা ও দোয়া মুখস্থ করে কাজ চালিয়ে যেতেন। তারা সাধারণত নাগরি হরফে গান লিখেছেন। দোয়া কালাম শেখার জন্য শরিয়তি আলেমদের মুরশিদ মানতেন। ১৮৪০ সালে দিকে পীর সৈয়দ শাহ নুর শাহ’র সৈয়দপুরে বসতি করেন। সৈয়দপুরে তার অনেক ভক্ত অনুসারী ছিলেন। ভক্ত অনুরাগীদের পক্ষে সৈয়দপুরে তাঁকে একটি বাড়ি দেয়া হয় যা তালুকদার শফি বেগের নাতি সওদাগর মাহমুদ বেগের মালিকানা ছিলো। চারিদিকে পীর মুরশিদের জয়জয়কার, সৈয়দপুরে তাদের আনাগোনা বাড়লো। সমাজে কুসংস্কার বেড়ে চলছে। আলেম সমাজে অসহায়ত্ব বাড়লো। ব্রিটিশ শাসনে শরিয়া আন্দোলন ধীর হল। ধর্ম কর্ম পরিবার কে›্দ্িরক হয়ে গেল। এ দিকে বানিয়াচং এর জমিদার কঠিন সময় পার করছে। করের দায় সংকোচনে তারা জমিদারি ছোট করতে লাগলেন। তারা অনেক কর্মচারিদের ভূমি দান ও বিক্রি করলেন। ১৮৫০ দশকে সৈয়দপুরে কতক বড় গৃহস্থের পরিচয় ঘটে। তাদের একজন আছিন আলীর পুত্র সৈয়দ আমিন আলী অন্যজন তালুকদার উজিয়াল এর নাতি সৈয়দ ইছাব আলী। উভয়ই গৃহস্থালি কাজের জন্য বিশাল বসতবাড়ি করেন। আজও যা লম্বা হাটি নামে পরিচিত। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে মানুষজন কৃষির বাহিরে বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকলেন। ব্যবসা বানিজ্যে মহাজনি ও দাদন ব্যবসা যুক্ত হল। জীবন জীবিকার তাগিদে অনেকে বিভিন্ন স্থানে গমন করেন। তৎকালীন সময়ে সৈয়দপুরের গৃহস্থ পরিবারে দ্বীনি শিক্ষার প্রসার ঘটে। বিশেষ করে তালুকদার রাজা, মনসুর, ছয়েফ, ছৈইদ, আমীন পরিবারে তরুণ আলেম জন্মান।
    ১৮৪০ দশকের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল শায়েখ কেরামত আলী জৌনপুরী (র.) সৈয়দপুরে আগমন। হযরত কেরামত আলী জৌনপুর (র.) নির্দেশে আজান সহ জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। সকলের সম্মতিতে গ্রামের মধ্যভাগে অবস্থিত মৌলভী আতহার আলী প্রতিষ্ঠিত খানকা সংস্কার ও বর্ধিত করে মসজিদ করা হয়। ওই স্থানটি তালুক মালিকানা হওয়ায় বরকত উল্লা গং সহ সকল পক্ষ হতে গ্রামের পঞ্চায়েতের নামে এজমালি দলিল করা হয়। এদিকে হযরত কাছার গমন করলে শায়েখ রমিজ আলী সঙ্গী হন এবং পরবর্তীতে তালিম নিতে রঙ্গপুরে (রংপুর) গমন করে ফিরে আসলে রঙ্গী শাহ নামে পরিচিত হন। ফরায়জী আন্দোলন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে তরান্বিত করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবে আলেম সমাজের সম্পৃক্ততা ছিল। শায়েখ আলেমদের উপর নির্যাতন বেড়ে যায়। ফরায়জী আন্দোলনের প্রভাব সর্বত্র পড়তে লাগলো। তাই প্রায় সকলেই ছদ্মনাম ধারণ করে। ১৮৬১ সালে তাখ জরিপ শুরু হলে নতুন বসতি ও গন স্থানান্তর ঘটে। জমির মালিকানা বদল হয় ও নতুন জমিদার সৃষ্টিকে তরান্বিত করে। তবে বানিচংয়ের ও পাইলগাঁওয়ের জমিদারি সংকোচিত হয়। তখন সিলেট অঞ্চলে বাংলা ভাষায় দলিল লেখার প্রচলন ঘটে। সিলেট অঞ্চলে বাংলায় গদ্য লেখা জানা লোকের খুব অভাব ছিল বিধায় অনেক বাংলা ভাষা শিক্ষিত জনের আগমন ঘটে। ১৮৬২ সালে সৈয়দপুরে প্রথম বাংলা স্কুল চালু করা হয়।

    লুসাই যুদ্ধের ফলে সিলেট ফৌজের সীমানা বাড়ায় নতুন ভূমি অধিগৃহিত হয়। ১৮৭১- ১৮৮০ সাল পর্যন্ত চলা জরিপ হামিদ বখ্ত মজুমদার সম্পন্ন করেন। মোট ১৪৪,১৮৫ একর ভূমির মধ্যে ২১৮০২ একর আবাদী ভূমি চিহ্নিত করে বন্দোবস্ত দেয়া হয়। মূলত. ১৭৯৩ সালের ১৪নং রেজুলেশনের রাজস্ব বিক্রয় আইন (সূর্যাস্ত আইন), নতুন অধিকৃত ভূমি, ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রভৃতি কারনে জমি ও জমিদারির মালিকানা ঘন ঘন বদল হতে থাকে। এদিকে সৈয়দপুরের মুন্সি-মৌলবীদের নাম ডাক সর্বসত্র ছিল। বিশেষ করে বর্গা কৃষকরা হস্তান্তর যোগ্য দখল মালিকানা প্রাপ্ত হলে দলিল লেখকের গুরুত্ব বাড়ে। মুলত ফার্সি ভাষায় শিক্ষিতরা দলিল লেখক হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ওই সময় সৈয়দ হাফিজ আলী ও তার পরিবার প্রচুর ভূ-সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন এবং দখল অক্ষুন্ন রাখতে ছৈইদ-আমীন গোষ্ঠী নামে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। জমির মালিকানার জন্য দখল অত্যাবশ্যকীয় হওয়ায় শক্তি অর্জন করা প্রয়োজন ছিল। তাই গোষ্ঠী প্রথা প্রচলন সর্বত্র ছিল। অনেক অবস্থাশালী তালুকদার জমিদারদের ন্যায় লাঠিয়াল রায়েত নিয়োগ করেন। মরমী সাধকদের মধ্যে মারিফত-শরিয়ত বিভাজন লক্ষণীয় ছিল। এদিকে সৈয়দপুরের অনেক মরমী সাধক শীষ্য অনুরাগী নিয়ে জ্ঞাতি স্বজনের দখল মালিকানা সহযোগিতা করতে গ্রামে ফিরলেন। অপরদিকে ব্রিটিশ বিরোধী আলেম উলামাদের পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসল। শায়েখ রমিজ উদ্দিন কোরাইশী অনুসারী একঝাঁক তরুণ আলেম জিহাদে গমন করলে তারা আর ফিরে আসেননি। তখন মৌলভী আতহার আলী (মৌলবি মোজ্জাফ্ফর আলী, মৌলবি ইছিম আলী, মৌলবি রইছ আলী) ও কতক তালুকদার পরিবারে পুরুষ শূন্য হয়ে পরে, শুধু মাত্র নারী ও শিশু, বৃদ্ধগণ সংসারে ছিলেন। শিশু-কিশোর ও নারীরা সংসারের হাল ধরেন। তখন বৈবাহিক সূত্রে অনেক সম্ভ্রান্ত বংশীয়দের আগমন ঘটে। যাদের অনেকে সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় গোষ্ঠী বদ্ধ হয়ে নিজেদের সুদৃর অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এদিকে শায়েখ মাহমেদ এর পুত্রদের মধ্যে শায়েখ আজিম ও মৌলবী চান্দ আলী প্রচুর ভূ-সম্পদ অর্জন করেন এবং তাদের জ্ঞাতদের নিয়ে গুষ্টি বদ্ধ হন। অন্যদিকে সৈয়দ হাফিজ আলীর পুত্র সৈয়দ ওয়াসিল আলী জমিদারি ও চৌধুরী পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সূর্যাস্ত আইনের কবলে পড়লে অনেক সম্পত্তি হাতছাডা হয়। তখন খাজনা পরিশোধে কঠিন অংশীদারী শর্তে মৌলবি চান্দ আলীর সহযোগিতা নেন। সৈয়দ ওয়াসিল আলীর অকাল মৃত্যুর পর মিয়া সৈয়দ আমজদ আলী চৌধুরী শর্তপূরণে অস্বীকার করায় বিষয় আদালতের মাধ্যমে মিমাংসিত হয়। অতপর মৌলবী চান্দ আলী ভাইপো মৌলবি জবান উল্লাহ বিশাল সম্পত্তি ভোগদখলে গোষ্ঠীর পরিচালনা করেন। এছাড়া ঐতিহ্যগত ভাবে শিক্ষা ও জনহিতকর কার্যে তাদের অবধান অব্যাহত রয়েছে। ১৯ শতকের প্রথম দিকের আলহাজ্ব হযরত উল্লাহ কোরেশি ওয়াক অফ স্ট্রেইট অন্যতম প্রতিষ্ঠান। অন্যান্যদের মধ্যে উজিয়াল-চান গোষ্ঠী, আম্বর আলী গোষ্ঠী, সব্দি গোষ্ঠী, বেগ গোষ্ঠী, ফুল সৈয়দ গোষ্ঠী,সরদার গোষ্ঠি প্রভৃতি গঠিত হয়। পরবর্তীতে বিংশশতাব্দীতে কেয়াম উল্লা গোষ্ঠি, শেখের গোষ্ঠী, খা গোষ্ঠী, মল্লিক গোষ্ঠী, কোরেশী গোষ্ঠী প্রভৃতি প্রকাশ পায়। সমসাময়িকালে উল্লেখযোগ্য হলেন মৌলবী গোলাম হায়দার, মৌলবী শুকুর উল্লা, সৈয়দ বখতিয়ার আলী, সৈয়দ সুন্দর আলী, মৌলবি মোজাফফর আলী, সৈয়দ আম্বর আলী, মৌলবি রইছ আলী, খুরশেদ বেগ, সৈয়দ আকবর আলী, সৈয়দ আমতর আলী, সৈয়দ মিয়া আজমল আলী চৌধুরী, সৈয়দ ইসমাইল আলী, সৈয়দ আব্দুল আজিজ চৌধুরী, সৈয়দ হাতিম আলী, সৈয়দ হারিছ আলী, মৌলবী সৈয়দ ডুখই, মৌলভী সৈয়দ মুবই, মৌলভী রোসন আলী, মৌলভী চান্দ আলী, সৈয়দ মাহফুজ আলী, কাজী শরাফত আলী, মৌলভী সৈয়দ এমদাদ উল্লা, মৌলভী জবান উল্লাহ, মৌলভী আব্দুল্লাহ, মৌলভী সৈয়দ আহমদ আলী, মৌলভী মল্লিক জহুর উদ্দিন কাজী, মৌলভী মল্লিক আজির উদ্দিন, মৌলভী আব্দুল মজিদ শিকদার প্রমুখ। মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) সহ কিছু সরকার পৃষ্ঠ পোষকতায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কদর বাড়ে। ১৯০৩ সালে সৈয়দপুর ও তৎসংলগ্ন মুসলিম শিক্ষানুরাগীগণ সৈয়দপুর শামসিয়া ইংলিশ মিডিয়াম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত প্রজন্মের প্রকাশ ঘটে। তাদের মধ্যে কাজী সৈয়দ আব্দুর রউফ, ক্বারী সৈয়দ হাবিবুর রহমান, মৌলবি সৈয়দ আব্দুল্লাহ, সৈয়দ হাফিজ আলী, সৈয়দ মুন্সিফ আলী, মৌলানা সৈয়দ জমিলুলল হক, শায়েখ সৈয়দ আব্দুল খালিক, শায়েখ সৈয়দ তখলোস হোসেন, মৌলানা সৈয়দ আবুল হোসেন, ক্বারি সৈয়দ কলমদর আলী, মৌলানা মুহিবুর রহমান কোরেশী, অডিটর সৈয়দ ইনসাফ আলী, সৈয়দ আওলাদ হোসেন, সৈয়দ আওছাফ হোসেন, মৌলানা আব্দুল ওহহাব, মৌলানা সৈয়দ নোমান আলী, অডিটর আজিজুল রহমান কোরেশী, সৈয়দ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ আরজুমন্দ আলী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। শায়েখ করম মোহাম্মদ কোরেশীর বংশের উত্তর প্রজন্মের মধ্যে, আঞ্জব উল্ল্যা কোরেশী, ইয়াকুব উল্ল্যা কোরেশী, সৈয়দপুর আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক মোতাওয়াল্লি আবুল বশর কোরেশী, ইলিয়াস হোসেন কোরেশী, অডিটর মতিউর রহমান কোরেশী, আবদাল হোসেন কোরেশী, ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন কোরেশী, ড. সিরাজুল ইসলাম কোরেশী প্রমুখ।

    বর্তমান সৈয়দপুর গ্রাম সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত। প্রায় হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সম্বৃদ্ধ একটি জনপদ। রতœা বরাং এ নির্ভরশীল আদি জনগোষ্ঠীর সাথে আর্য, আরব সংমিশ্রণ জীবন জীবিকায় বৈচিত্রময় করেছে এবং কালের পরিক্রমায় সমৃদ্ধি নিয়ে এসেছে। রোমাঞ্চ প্রিয় এই অঞ্চলের জনগণ প্রাচীন কাল হতে বিদেশগামী ছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ ইউরোপ-আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের অর্জন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। এই নিবন্ধে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা আজ আমাদের সাথে নেই। সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

    বাংলাদেশ সময়: ৩:০১ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৬ জুন ২০২১

    dainikbanglarnabokantha.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ