• শিরোনাম

    আমার প্রিয় নায়ক রহমান

    অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২০ | পড়া হয়েছে 277 বার

    আমার প্রিয় নায়ক রহমান
    apps

    নূরুদ্দীন দরজী: এমন একটি সময় ছিল অনেক মানুষ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তাদের পছন্দের ব্যক্তি নির্বাচন করতো। যাদের আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করতো। তেমন; আমার প্রিয় শিক্ষক, আমার প্রিয় কবি, আমার প্রিয় নেতা এবং আমার প্রিয় নায়ক বা নায়িকা। আজকাল এগুলো তেমন শুনা যায় না। পাঠ্য রচনা ব‌ইতে কিছু কিছু আছে যেগুলো নিজের পড়াশোনার স্বার্থে অর্থাৎ পরীক্ষা পাশের জন্য পড়তে হয়। আগের দিনে দেখতাম একজন অন্য জনকে ,এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে প্রশ্ন করে জানতে চাইতো-তোমার প্রিয় শিক্ষক, কবি ,নেতা বা নায়ক নায়িকা কে? নায়ক নিয়ে আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে আমি বলতাম, আমার প্রিয় নায়ক রহমান। শুধুই যে বলেছি তা নয়-প্রকৃত‌ই রহমান ছিলেন আমার দৃষ্টিতে একজন রুচিশীল আদর্শ নায়ক। তার ব্যক্তিত্ব অভিনয় শৈলী সব কিছুই ভাল লাগতো। রহমান আমার প্রিয় নায়ক।

    বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত দর্শক প্রিয় রোমান্টিক নায়ক।১৯৩৭ সালে পঞ্চগড় জেলার এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তৎ সময়ে সিনেমায় অভিনয় করাটা ছিল খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। দুরন্ত ছেলে একদিন তার বাবাকে না বলে অভিনয়ের নেশায় ঢাকা চলে আসেন। চাকরি নেয় ঢাকার শাহবাগ হোটেলে। কিন্তু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল কিভাবে অভিনয় জগতে ঢুকা যায়। কি জানি কি বরে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। দেখা পেয়ে যান তখনকার বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম এর সাথে। তিনি রহমানকে সুযোগ দেন তার প্রখ্যাত – এ দেশ তোমার আমার-ছবিতে। এ ছবিই নায়ক রহমানের প্রথম অভিনীত ছবি। অবশ্য এ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন ভিলেন চরিত্রে তথাকথিত জমিদারের ছেলের ভূমিকায়। কিন্তু প্রথম অভিনয়‌ই দর্শকদের নজর কাড়েন ,সবার মন জয় করে ফেলেন। ,এ দেশ তোমার আমার, ছবির নায়ক ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা খান আতা ও নায়িকা সুমিতা দেবী।
    শুরু হয় রহমানের পথ চলা। বেশ কয়েকটি ছবিতে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। শুধুই নায়ক নন রোমান্টিক নায়ক। জুটি বাঁধেন আরেক দর্শক প্রিয় নায়িকা শবনমের সাথে। তখন পাকিস্তান আমল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সদ্য স্বাধীন দেশের উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে চলচ্চিত্র শিল্প গন্য হয়ে আসছিল। রহমান বাংলা, উর্দু এবং পশতু তিনটি ভাষায় অভিনয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।১৯৫৯ সালে অভিনয় শুরু করে জনপ্রিয়তা তখন আকাশ চুম্বি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হানা দেয়।১৯৬৩ সালে মাত্র পাঁচ বছর অভিনয়ের এক পর্যায়ে উর্দু ছবি ,প্রীত না জানে রীত, এর সূটিং করতে সিলেট যান। সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় তার একটি পায়ে প্রচন্ড আঘাত পান। পরবর্তীতে পাটি কেটে ফেলতে হয়। রহমানের ক্যারিয়ারে ধ্বস নেমে আসে। তখন কোন কোন মানুষ বলতো -রহমান নাকি হজরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজারে গিয়েছিলেন জুতা পা দিয়ে – যার জন্য এমন হয়েছে। কিন্তু এ সবের কোন সত্যতা কেউ বলেননি। দীর্ঘ দিন অভিনয় থেকে দূরে বহুদূরে। অনেক ব্যর্থ চিকিৎসার পর একটি কৃত্রিম পা লাগানো হয়। তিনি অলসে বসে বাড়িতে। কিন্তু সহসাই অভিনয়ের জন্য তার অদম্য ইচ্ছার কাছে হারানো পা হার মানে। এ পা নিয়েই ছটফট করা রহমান পুনরায় অভিনয়ে ফিরে আসেন। পুরোদমে কাজ শুরু করেন।

    রহমানের উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে-দরশন, মিলন, চাহাত ,চান্দা,বাহানা, লগন, তালাশ গোড়ী,প্যায়সা,এইতো জীবন, হারানো দিন, জোয়ার ভাটা, পাহাড়ি ফুল,রাজধানীর বুকে সহ অসংখ্য ছবি। শেষ জীবনে এসে তিনি ,দেবদাস ও সুখের সংসার ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শক মনে দাগ রেখেছেন। , সুখের সংসার, তার জীবনের সর্বশেষ ছবি। তিনি বহ ছবি পরিচালনা ও করেছেন। তখনকার দিনে অনেকেই রহমানকে উত্তর কুমারের ডুপ্লিকেট মনে করতেন। রহমান দেখতে অনেকটা উত্তমের মত। তৎকালীন সময়ে যখন সিনেমার স্বর্ণ যুগ ছিল রহমান ভারতীয় ছবির সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা ছবি নির্মাণ করেছেন। যে সমস্ত সুপ্রিয় দর্শক তার অভিনীত ও পরিচালিত , হারানো সুর, জোয়ার ভাটা ও রাজধানীর বুকের মত ছবিগুলো দেখেছেন তারা অবশ্যই রহমানকে কোন দিন ভুলতে পারবেন না। উত্তম সুচিত্রা জুটির সাথে প্রতিযোগিতায় থাকতো রহমান শবনম জুটি।
    ২০০৫ সালে এ দর্শক প্রিয় নায়কের মৃত্যু হয়। যে পঞ্চগড় থেকে সিনেমার নেশায় একদিন পালিয়ে এসেছিলেন তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে চির নিদ্রায় সেখানেই শায়িত করা হয়েছে। শেষ জীবনে এসে কৃত্রিম পা আর কাজ করছিল নি। তিনি ঢাকায় থাকলেও ঘর থেকে তেমন একটা বের হতে পারতেন না। রহমান অনেক বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন। তখন একবার চিত্রালী পত্রিকায় পড়েছিলাম-নায়ক রাজ্জাক একটি মন্তব্য করেছিলেন যে,-তার অভিনয়ের কোন প্রতিদ্ধন্দ্বি খুঁজে পাননি বলে। বিষয়টি রহমানের দৃষ্টি গোচর হলে রহমান বলেছিলেন-,’সমুদ্রের ঢেউ দেখেছ কিন্তু শ্যাওলা দেখনি,। প্রতি উত্তরে কিংবদন্তি জনপ্রিয় অভিনেতা রাজ্জাক রহমানকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বলে ফিরতি বক্তব্য দিয়েছিলেন। আরও বলেছিলেন,-পা না হারালে নায়ক রহমান অনেক কিছু করতে পারতেন ।
    রহমান ছিলেন তরুণ সমাজের অভিনয়ে আদর্শের প্রতিচ্ছবি। তার রুচিশীল অভিনয় মানুষ পারিবারিক ভাবে দেখতো। তাঁর বিরুদ্ধে কোন স্কান্ডাল কোন দিন শুনিনি। যতটুকু জানি কুমকুম নামে তার একমাত্র স্ত্রী ছিলেন। এ আদর্শের মূর্ত প্রতীক নায়ক রহমানের অভিনয় দর্শক হৃদয়ে আজীবন লালিত হবে কোন সন্দেহ নেই। রুচিশীল সিনেমা দেখতে হলে আজ‌ও রহমান শবনম জুটির ছবিগুলো যে কেউ দেখতে পারেন।
    লেখকঃ কলামিস্ট ও সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)

    বাংলাদেশ সময়: ১১:১২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২০

    dainikbanglarnabokantha.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    নায়িকা হয়েও কবি ছিলেন

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

    রূপা

    ২৪ অক্টোবর ২০২০

    কৃষি ব্যাংক নিয়ে গান

    ৩০ নভেম্বর ২০২০

    অসভ্যতার বিজয় কেতন

    ০৯ অক্টোবর ২০২০

    কৃষ্ণ কলি

    ০৫ অক্টোবর ২০২০

    আর্কাইভ