• শিরোনাম

    আমাদের বঙ্গ জননী গরিব ছিলনা

    অনলাইন ডেস্ক | রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | পড়া হয়েছে 236 বার

    আমাদের বঙ্গ জননী গরিব ছিলনা
    apps
    নূরুদ্দীন দরজী:
    চিরদিন কাহার ও সমান নাহি যায়। কবির এমন মর্মবাণীকে সম্পূর্ণ স্বীকার করেও বলতে হয় , এজন্য মানুষ‌ই দায়ী। ব্যক্তির  ধন বা ঐশ্বর্য তার নিজের দোষেই নষ্ট হয়, চলে যায়। পরিবারে, সমাজে অথবা রাষ্ট্রে এমন কিছু লোক জন্ম নেয় যারা পরিবার , সমাজ অথবা দেশকে  ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যেতে  পারে।
    আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বঙ্গ জননী এক সময় ফুলে ফসলে ভরা ছিল। ছিল গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু। অনেক সুখে স্বচ্ছন্দে চলছিল বাঙালি জাতি। অনেক পর্যটক বাংলার ঐশ্বর্যের কথা বলেছেন অকপটে  তাদের লেখনিতে। ফরাসী পর্যটক ফ্রাসোয়া বার্ণিয়ার বাংলার প্রকৃতি ও ঐশ্বর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন,’বাংলাদেশে প্রবেশের হাজারো পথ আছে -কিন্তু বের হবার একটি পথ‌ ও নেই। ১৭৫৭ সালে চির বিশ্বাসঘাতক বেইমান মীর জাফর ও তাদের কুলাঙ্গার দোসররা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আমাদের স্বাধীনতা বিক্রি করে দিয়েছিল ইংরেজদের কাছে। পলাশী প্রান্তরে নবাব সিরাজের ভাগ্য  বিপর্যয় ঘটলে আমাদের গলে ঝুলে যায় পরাধীনতার শৃঙ্খল। ঠিক তখন থেকেই বাংলার সম্পদ বেনিয়ারা লুটে নিতে আরম্ভ করে নিঃশ্ব  করতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন,ঈস্ট  ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় দখল করে তখন এ দেশ খুবই সমৃদ্ধশালী ছিল। এমনি সম্পদ ছিল যে, মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী ইচ্ছে করলে গোটা বিলেত শহর কিনে নিতে পারতো। বেইমানরা সম্পদ লুটে লুটে হয়রান ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এর সপক্ষে আরও বহু প্রমাণ পাওয়া যায়। তেইশ বছরে নিষ্ঠুর পাকিস্তানিদের  শোষণের কথা বাঙালি মাত্র‌ই জানে। আমাদের সম্পদ পাচার করে দিনের পর দিন হাড় গুরো করেছে নিঃশ্ব করেছে।
    বাংলার সম্পদ বিবেচনায় আরও পিছনে তাকালে আসে সুলতানি  আমলে। সে আমলে বাংলার সুযোগ্য  শাসক ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ। তাঁর আমলে বাংলায় ধন সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমান আরব দেশকে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করতেন গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ। বাংলার অর্থে তিনি  মক্কা মদিনায় বহু সংখ্যক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। মাদ্রাসাগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল ,গিয়াসিয়া’ মাদ্রাসা। তখন আরব দেশের অনেক মানুষের সন্তানেরা ,গিয়াসিয়া’ মাদ্রাসায়’ পড়াশোনা করতো। অন্য কোন সহযোগিতায় নির্মিত তাদের একটি বিশাল পানির ফোয়ারা অকেজো হয়ে পড়লে আমাদের সুলতান ,নাহারে যোবাইদা’ নামক ফোয়ারাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। একবার তিনি ৩০,০০০ স্বর্ন মুদ্রা আরব দেশে ছদকা হিসেবে দিয়েছিলেন। একটি স্বর্ন মুদ্রা সমান যদি এক ভরি স্বর্ন হয় তবে বর্তমান বাজারে এর পরিমাণ বের করা দূঃসাধ্য নয়। অথচ সে সৌদিরাই এখন আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে। তৎকালীন সময়ে একবার ইরান দেশে বড় একটি দুর্ভিক্ষ হয়। খাদ্যের অভাবে তাদের জীবন মরণ সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় । সুহৃদ গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ প্রচুর খাদ্য শস্য জাহাজ ভর্তি করে প্রেরণ করেছিলেন। সে অর্থের বিনিময় করতে না পারলেও ইরানি কবি গোলাম হাফিজ একটি গজল লিখে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন সুলতানকে। বাংলার সুলতানগণ মোগলদের সাথে পরাজিত হলে তার পরও বাংলার ধন সম্পদ বিভিন্ন ভাবে তসরুপ বা লুটে নেওয়া হয়েছিল। মক্কা মদিনায় বিশ্বনবী মুহম্মদ(সঃ) এর জন্ম ও কর্মের স্মৃতিতে ধন্য বলেই সে দেশের প্রতি একটি সহজাত দুর্বলতা রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য এ দেশের মানুষ প্রথমেই বেছে নেয় সৌদি আরবকে।
    আমাদের দেশের মাটির উর্বরতা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ থেকে অনেক বেশি। এখানে সত্যি সোনা ফলে বলা যায়। এ দেশ সোনার দেশ,সোনার বাংলা।  এখন পর্যটন ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের  মাথাপিছু আয়  বেশি। কিন্তু তাদের অনেক মাটিই অনুর্বর।ফসল ফলে না। কিন্তু সোনার বাংলার মাটিতে যে কোন বীজ যে কোন জায়গায় ফেললেই ফসল হয়ে ফুলে উঠে। এমন কি বীজ না ফেললেও অনেক গাছ গাছালির জন্ম হয়।  ফরাসী, পর্তুগিজ বা ডাচরা না পারলেও ইংরেজরা এ দেশে শক্ত খুঁটি  গাড়তে সমর্থ হয়েছিল। তাদের প্রায় দুশো বছর শোষণ , পাকিস্তানের তেইশ বছরের নির্যাতন ও বৈষম্য নীতির কারণে আমাদের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পরের হাতে দিয়ে গরিব হতে থাকি।এক সময় আমাদের মেরুদন্ড অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের দলিলে স্বাক্ষরকারী ইংল্যান্ডের একজন গভর্নরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল-কেন বাংলার প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন এ দেশের সম্পদের প্রতি তাদের আকৃষ্ট হ‌ওয়ার কথা।
    এখন আমাদের দেশ স্বাধীন দেশ।  বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমে,জেল জুলুম খেটে তার  ফসল হিসেবে তাঁর‌ই আহ্বানে ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা আসে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ করে অনেক রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি  স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার প্রায় চল্লিশ বছর পর থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ তার আপন গৌরবে ফেরার পথ খুঁজে পেয়েছে। বাংলা মায়ের বদনে দেখি আজ উজ্বল হাসির রেখা। আমরা এখন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের সাথে সামিল হওয়ার পথে বহুদূর এগিয়ে।  আমাদের অর্জন, আমাদের পতাকা সগৌরবে থাকবে বিশ্বময় উডডীন। বঙ্গবন্ধু নেই-কিন্ত রয়েছে তাঁর প্রেরনা ও আদর্শ। সে পথেই  জনগণকে সঙ্গে নিয়ে  বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলার আপামর  মানুষকে  এগিয়ে নেওয়ার দিশারী। তাঁর  সুনির্দেশনায়  অবশ্যই ফিরে আসবে আমাদের হারানো ঐতিহ্য গৌরব ,আমরা হবো বিশ্বের অন্যতম প্রাচুর্য পূর্ণ দেশ ও উন্নত জাতি।
      লেখকঃ কলামিস্ট ও সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)

    বাংলাদেশ সময়: ৫:১৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

    dainikbanglarnabokantha.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ